৭ খুন এক মামলার বাদির আদালতে সাক্ষ্য প্রদান:এখনো পলাতক যে ১২ জন

306

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম: সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা দু’টি মামলার একটির বাদির সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের মামলার বিচার কাজ আনুষ্ঠিত শুরু হয়েছে। এদিকে সাক্ষ গ্রহনের সময় আদালত থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেন পিপি ওয়াজেদ আলি খোকন। এনিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরী হয়। এর প্রতিবাদ জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের (এনইউজে) সাধারন সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেছেন, নূর হোসেন দেশে ফেরার পর থেকে একের পর এক বিষয় দিয়ে মামলাটিকে প্রভাবিত করার একটি পায়তারা আমরা লক্ষ করছি। বিচারের স্বচ্ছতা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে দেয়া প্রয়োজন।
সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দিয়ে ঢাকা ও গাজীপুর থেকে ৫ এবং নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ১৮ আসামীকে আদালতে হাজির করা হয়। বিচারক তার চেয়ারে বসার আগেই সাংবাদিকদের আদালত কক্ষ থেকে বের করে দেয়া হয়। আদালত উপস্থিত বিভিন্ন আইনজীবি সূত্রে জানা যায়, গতকাল সাত খুনের ঘটনায় দায়ের করা দু’টি মামলার একটির বাদি ডা. বিজয় কুমার পালের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ আড়াইঘন্টা একটানা জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে চলে সাক্ষ্য গ্রহণ। ওই ঘটনায় দায়েরকৃত ২টি মামলার একটির বাদি ডা. বিজয় কুমার পাল গতকাল আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। ডা. বিজয় কুমার পাল ৭ খুনের ঘটনায় নিহত আইনজীবী অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের বড় মেয়ের জামাতা। সকাল সাড়ে ১০ টায় বিচারক বিচারকাজ শুরু করলেও ডা. বিজয় সাক্ষ্য প্রদাণ করতে কাঠ গড়ায় দাঁড়ান সকাল পৌনে ১১টায়। এরপর তিনি আদালতের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার বক্তব্য উপস্থাপন শেষে আসামী পক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা শুরু করেন। তবে আসামী পক্ষের আইনজীবীদের জেরা প্রাণবন্ত ছিল না। আসামী পক্ষের আইনজীবীদের বেশির ভাগই অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ে বাদিকে জেরা করেন। দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত একে একে ২২ আসামীর আইনজীবী বাদিকে জেরা করেন। ২২ আসামীর মধ্যে ১০ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকী ১২ আসামী পলাতক। পলাতক আসামীদের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবীরা জেরা করেন।
এদিকে মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেন, র‌্যাব-১১’র সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ এবং উপ অধিনায়ক এমএম রানার পক্ষে তাদের আইনজীবীরা বাদিকে জেরা করার জন্য সময় প্রার্থণা করেন। বিচারক তা মঞ্জুর করে আগামী ৭ মার্চ বাদিকে জেরার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন।
উভয় মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ আসামীর মধ্যে ২৩ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পলাতক ও উপস্থিত আসামীদের মধ্যে গতকাল ২২ জনের আইনজীবী বাদিকে জেরা করেন। ৩ জনের পক্ষে আদালতে সময় প্রার্থণা করলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন। উপস্থিত বাকি ১০ আসামীর আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তারা বাদিকে জেরা করতে পারেননি। বিচারক এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেন আগামী ৭ মার্চ। এছাড়া আগামী ৩ মার্চ ৭ খুনের ঘটনায় দায়েরকৃত অপর মামলার বাদি সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য নেওয়া তারিখ ধার্য করেন বিচারক। সেলিনা ইসলাম বিউটি গতকালও আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
আদালতে পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, গতকাল ৭ খুনের ঘটনায় দায়েরকৃত ২ মামলার একটির বাদি ডা. বিজয় কুমার পাল সাক্ষী দিয়েছেন। সাক্ষী শেষে তাকে পলাতক ও উপস্থিত ২২ আসামীর আইনজীবীরা জেরা করেন। গতকাল জেরা শেষ না হওয়ায় আগামী ৭ মার্চ পরবর্তী জেরার তারিখ ধার্য করা হয়েছে। এছাড়া অপর মামলার বাদি সেলিনা ইসলাম বিউটি আদালতে উপস্থিত থাকলেও সময় সংকুলান না হওয়ায় তার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ৩ মার্চ ধার্য করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা জানান, বিচার কাজ শুরুর আগে আদালতে প্রবেশের সময় পুলিশ প্রথমে সাংবাদিকদের বাধা দেয়ার চেষ্টা করে পুলিশ। আদেশটি আদালতে কিনা এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে পুলিশ কর্মকর্তারা কোন কথা না বলে সাংবাদিকদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়। কিন্তু সাংবাদিকরা আদালত কক্ষে প্রবেশ করায় উত্তেজিত হয়ে ওঠেন মহানগর আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক এডভোকেট খোকন সাহা। তিনি আদালত কক্ষে কর্তব্যরত পুলিশকে এজলাস থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেয়ার জন্য বলতে থাকেন । তিনি বলেন আজ আদালতে সাংবাদিকরা থাকতে পারবেনা। কিছুক্ষন পরে পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট ওয়াজেদ আলি খোকন আদালত কক্ষে এসে বলেন, পোষাক পরিহিত আইনজীবি, পুলিশ ও বিচার সংশ্লিষ্টরা ছাড়া অন্য কেউ আদালতে থাকতে পারবে না বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন। এসময় পুলিশ আদালত কক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেয়। বিচারকার্যের একদম শেষ পর্যায়ে একটি প্রভাবশালী পরিবারের অনুগত কয়েকজন সাংবাদিককে আদালত কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এডভোকেট খোকন সাহা, পিপি ওয়াজেদ আলি খোকন দু’জনেই আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। এবং নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এমপি শামীম ওসমানের লোক হিসেবে পরিচিত।
বাদি পক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আসামী পক্ষ গতকালও সাক্ষ্য গ্রহণ বানচাল করার চেষ্টা করেছিল। কিছু আইনজীবি আদালত কক্ষে সে চেষ্টা করে। তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি বিজ্ঞ বিচারকের কারণে। আদালতে একটি মামলার বাদি ডা. বিজয় কুমার পাল সাক্ষ্য প্রদাণ করেছেন। পরে তাকে ২২ আসামীর নিয়োজিত আইনজীবীরা পর্যায়ক্রমে জেরা করেন। গতকাল জেরা শেষ না হওয়ায় আদালত ডা. বিজয় কুমার পালকে জেরা করার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন আগামী ৭ মার্চ। এর আগে আগামী ৩ মার্চ অপর মামলার বাদি ডা. সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য প্রদাণের তারিখ ধার্য করা হয়েছে। যদিও বিউটি গতকাল সাক্ষ্য প্রদাণের জন্য আদালতে উপস্থিত ছিলেন। সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে না দেয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে না দেয়ায় আমাদের মধ্যে একটা সন্দেহ ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। এতে হয়তো ন্যায় বিচার বিঘিœত হতে পারে। এটি প্রকাশ্য আদালতে বিচার। প্রকাশ্য আদালতে বিচার হতে হলে সেখানে আইনজীবিরা থাকবে, বাদি থাকবে, বিবাদি থাকবে, মিডিয়া থাকবে এটাই আইনের বিধান। আমি আশা করবো আগামী তারিখে আইনের এ বিধান অনুযায়ী মিডিয়াকে প্রবেশ করতে দেয়া হবে।
পরে সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে না দেয়ার ব্যাপারে পিপি এডভোকেট ওয়াজেদ আলি খোকন জানান, আদালত নির্দেশ দিয়েছিলেন পোশাক পরিহিত বিচার সংশ্লিষ্টদের বাইরে অন্য কেউ আদালতে থাকতে পারবে না। সে অনুযায়ী আমি সকলকে বের করে দিতে বলেছি। যাদের এ মামলায় কোন কাজ নেই সেসব আইনজীবিরা আদালতে ছিলেন বিষয়টি জানালে তিনি বলেন, আইনজীবিদের আদালতে থাকা তাদের অধিকার। তিনি জানান, আগামী তারিখে পনের জন্য শীর্ষ সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আমি মন্ত্রনালয়ে কথা বলে এ ব্যবস্থা করছি।
এর প্রতিবাদ জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের (এনইউজে) সাধারন সম্পাদক আফজাল হোসেন পন্টি বলেন, আজকে আদালত কক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশ না করতে দেয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ মামলার বিচারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এটি বাধা হিসেবে কাজ করবে। সাত খুন মামলা অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর একটি মামলা। ইতিপূর্বে সাংবাদিকদের প্রবেশের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আদালত থেকে দেয়া হয়নি। কিন্তু একটি পক্ষ বারবারই সাংবাদিকদের আদালত কক্ষে বাধা দেয়া চেষ্টা করেছে। আজকে সকালে পুলিশ দিয়ে সাংবাদিকদের প্রথমে আদালত কক্ষে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। পরে পিপি এসে জানান, আদালত সাংবাদিকদের প্রবেশের ব্যাপারে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নূর হোসেন দেশে ফেরার পর থেকে একের পর এক বিষয় দিয়ে মামলাটিকে প্রভাবিত করার একটি পায়তারা আমরা লক্ষ করছি। বিচারের স্বচ্ছতা ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে দেয়া প্রয়োজন।
মামলার ৩৫ আসামীর মধ্যে যারা উপস্থিত ছিলেন তারা হলেন-নূর হোসেন, লে. কর্নেল (অব) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব) আরিফ হোসেন, লে. কমা-ার (অব) এমএম রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরজিও-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া ও বিল্লাল হোসেন, সিপাহী আবু তৈয়ব, কনসটেবল শিহাব উদ্দিন, এসআই পুণেন্দু বালা, ল্যান্স কর্পোরাল রহুল আমীন, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনসটেবল বাবুল হাসান, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, মামলা প্রধান আসামী নূর হোসেনের সহযোগি মোস্তফা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী এবং আবুল বাশার।
এখনো পলাতক যে ১২ জন
সাত খুনের ঘটনায় আদালতে যে ৩৫ আসামীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গঠিত হয়েছে তার মধ্যে এখনো ১২ জন পলাতক রয়েছে। ওই ১২ জনের মধ্যে মামলার প্রধান আসামী নূর হোসেনের ৪ সহযোগি রয়েছেন। বাকীরা র‌্যাব-১১’র সাবেক সদস্য। সেলিম, সানাউল্লাহ সানা, শাহজাহান এবং জামাল উদ্দিন। র‌্যাব সদস্য-কর্পোরাল মোখলেছুর রহমান, সৈনিক আবদুল আলীম, মহিউদ্দিন মুন্সি, আল আমীন শরীফ, তাজুল ইসলাম, সার্জেন্ট এনামুল কবীর, এএসআই কামাল হোসেন, কনসটেবল হাবিবুর রহমান।
চাঞ্চল্যকর এই মামলায় ৩৫ আসামীর মধ্যে মোট ২১ জন আদালতে স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দি প্রদান করেছেন। এছাড়া ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ১৫ র‌্যাব সদস্যসহ ২০ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল দুপুরে আদালত থেকে ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিঙ্ক রোড থেকে অপহৃত হন। অপহরণের ৩দিন পর ৩০ এপ্রিল শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয় জনের ও  পরদিন ১ মে আরো একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।#