২৭ মার্চ সংগ্রামী নারায়ণগঞ্জ বাসি তিন দিক থেকে পাকিস্তানী হানাদাদের প্রতিরোধ করে

541

মোহর আলী চৌধুরী: প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জ পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তম শিল্প ও বন্দর নগরী। এখানে এশিয়ার বৃহত্তম আদমজীসহ অসংখ্য জুট ও বস্ত্র মিলের শ্রমিকদের এবং তোলারাম কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের সংগ্রামী ঐতিহ্য দেশবাসীর নিকট স্বীকৃত ও প্রশংসিত। ১৯৪৮ সন থেকে আন্দোলন, সংগ্রাম ও অনেক ত্যাগের বিনিময়ে বাঙ্গালী ১৯৭০ সনের ডিসেম্বর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামীলীগের বিজয় অর্জনে সফল হয়। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী বিজয়ীদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর না করার জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলী ভূট্টো ষড়যন্ত্র শুরু করে। ১৯৭১ সনের ১লা মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আহুত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। এ খবর পাওয়ার সাথে সাথে ঐতিহ্যবাহী তোলারাম কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা ছাত্রলীগ ও কলেজ ছাত্র-ছাত্রী সংসদ নেতাদের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ শহরে এক দফা অর্থাৎ স্বাধীনতার মিছিল বের করে। বিভিন্ন সংগঠনের মিছিলে সংগ্রামী জনতা সন্ধা রাত পর্যন্ত শহর প্রকম্পিত করে তুলে। তারা স্লোগান দেয় ইয়াহিয়ার ঘোষণা বাঙ্গালীরা মানেনা, তোমার দেশ আমার দেশ বাংলাদেশ, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বীর বাঙ্গালী অস্ত্রধর- বাংলাদেশ স্বাধীন কর। হোটেল পূর্বাণীর সংসদীয় সভা থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছেন ইয়াহিয়ার ঘোষণা প্রত্যাহার করতে হবে। অন্যথায় ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাবো এবং সে পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। ১ মার্চ রাতে ঢাকায় স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লক্ষ ছাত্র-জনতার উপস্থিতিতে ডাকসুর ভি,পি আঃ সঃ মঃ আবদুর রবের নেতৃত্বে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতিতে পল্টনে স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ। ৪ মার্চ নারায়ণগঞ্জে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। ৫ মার্চ রহমতউল্লা ক্লাবে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকা জেলা গঠন করা হয়। যারা হলেনÑ আহ্বায়কঃ (১) মোঃ সিরাজুল ইসলাম, (২) যুগ্ম আহ্বায়কঃ আব্দুস ছাত্তার, (৩) মোঃ ফয়েজুর রহমান, (৪) মোঃ শাহজাহান, (৫) মোঃ মোবারক হোসেন, (৬) সাহাবুদ্দিন আহমেদ, (৭) খোরশেদ আলম দুদু, (৮) খবির আহমেদ, (৯) আব্দুর রাশেদ রাশু, (১০) শরফুদ্দিন রবি, (১১) কুতুবউদ্দিন মাহমুদ, (১২) আব্দুল মোতালিব, (১৩) মোহর আলী চৌধুরী, (১৪) আব্দুল আউয়াল মিলন (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ), (১৫) এম.এ. আউয়াল, (১৬) নাজিমউদ্দিন মাহমুদ, (১৭) তোফাজ্জল হোসেন খাঁন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বলিষ্ঠ ভূমিকায় সারাদেশে স্বাধীনতার আন্দোলন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে।
নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সভা ও আন্দোলন সংগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মিলনায়তন রহমতউল্লাহ ক্লাব। এই রহমত উল্লাহ ক্লাবেই স্বাধীন বাংলা ঢাকা জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রধান দপ্তর স্থাপন করা হয়। নব নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য একেএম শামসুজ্জোহা, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আফজাল হোসেন, প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য আঃ সাত্তার ভূঞা, সিটি আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আলী আহম্মদ চুনকা, স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামীলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ, শ্রমিক লীগের নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জের হাজার হাজার ছাত্র, শ্রমিক জনতা অসংখ্য বাস ট্রাকে করে ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হয়। লক্ষ লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে অসহযোগ আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচী ও স্বাধীনতার নির্দেশনা সহ বঙ্গবন্ধু ঘোষনা করলেন। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর দীর্ঘ ২৩ বছর বাঙ্গালীরা আন্দোলন সংগ্রাম করে ১৯৭০ সনের নির্বাচনে যে বিজয় ও দেশ পরিচালনার অধিকার অর্জন করে, ইয়াহিয়া খান ৫ মিনিটের ঘোষণায় তা নস্যাৎ করে দেয়। জনগণের রায়ই গণতন্ত্রের শেষ কথা। ঘোষণায় ইয়াহিয়া পাকিস্তানের গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে। ইয়াহিয়া পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বাধীনতার যুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বাধ্য করলো।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণের কর্মসূচী ও নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রহমতউল্লাহ ক্লাব থেকে প্রতিদিন সমগ্র নারায়ণগঞ্জসহ মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর (ঢাকা সদর) ও মানিকগঞ্জে সভা, সমাবেশ মিছিল সহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছে। সিনেমা হল গুলোতে পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের পরিবর্তে জয়বাংলা সংগীত পরিবেশন করছে। অসহযোগ আন্দোলনের সকল কর্মসূচী সফলভাবে ঢাকা জেলায় বাস্তবায়ন হচ্ছে। পরবর্তী কর্মসূচীর বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আঃ হাই এর নেতৃত্বে ১৭ মার্চ বিকালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে গমণ করি। বঙ্গবন্ধু আমাদেরকে পরিষ্কার বললেন ‘ওদের (পাকিস্তানিদের) সাথে কোন সমঝোতা বা মীমাংসা হবেনা, তোরা সবকিছু নিয়ে প্রস্তুত থাক। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের বুঝতে অসুবিধা হলোনা স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে নারায়ণগঞ্জ আসার পথে গাড়ীতে বসে ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আগামীকাল থেকে পশ্চিম দেওভোগ নাগবাড়ীস্থ ডিএসএস ক্লাবের মাঠে সশস্ত্র যুদ্ধের ট্রেনিং শুরু করতে হবে। প্রথমে নিজস্ব, আত্মীয়স্বজন, বেসামরিক প্রতিষ্ঠান সহ অন্যান্যদের অস্ত্র সংগ্রহ করতে হবে। অবসরপ্রাপ্ত বাঙ্গালী সামরিক কর্মকর্তা বা সদস্য, অবসর প্রাপ্ত পুলিশ ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে প্রশিক্ষক টিম গঠন করে তাদের দ্বারা ট্রেনিং দেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শেখ সহীদের মাধ্যমে ঢাকার ইকবাল হল থেকে নারায়ণগঞ্জের জন্য কিছু অস্ত্র দেওয়া হয়। ১৮ মার্চ থেকে পশ্চিম দেওভোগ ডি,এস,এস ক্লাবের মাঠে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ চালু করা হয়েছে।
এদিকে ইয়াহিয়া ও ভুট্টো ঢাকায় এসে সমঝোতার নামে প্রহসন শুরু করেছে। তারা বাঙ্গালীর মুক্তি সনদ ৬ দফার কতিপয় বিষয় বাদ দিয়ে সমঝোতার জন্য বঙ্গবন্ধুকে চাপ দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বাঙ্গালীদের স্বার্থের প্রশ্নে অনড়। ইয়াহিয়া ও ভূট্টো ভিতরে ভিতরে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের উপর হত্যাযজ্ঞ চালানোর জন্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনার ব্যবস্থা করেছে। পাঞ্জাবী সেনারা বাঙ্গালী সেনাদের নিরস্ত্র করতে গেলে জয়দেবপুরে নারায়ণগঞ্জের কৃতি সন্তান মেজর সফিউল্লাহর (পরবর্তীতে সেনা প্রধান) নেতৃত্বে বাঙ্গালী সেনারা বিদ্রোহ করে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২৩ মার্চকে বাংলাদেশ দিবস ঘোষণা করে। ঐদিন পূর্ব বাংলায় সর্বত্র স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করার জন্য কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দেশবাসীর প্রতি আহবান জানালে জনগণ অভূতপূর্ব সাড়া দেয়। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু খবর পাঠালেন আজ রাতে পাকিস্তানীরা অঘটন ঘটাতে পারে। নদী বন্দর গুলির নৌ-যান ঘাটে না রেখে ভাসিয়ে দূরে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ১ মার্চ থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ, আওয়ামীলীগ, ন্যাপসহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পেশাজীবিরা সারাদিন মিটিং মিছিল, গণসংগীতসহ বিভিন্ন কর্মসূচী আয়োজন করে জনতাকে স্বাধীনতায় উদ্বুদ্ধ করছে। রাস্তার জনগণ, খাওয়া ও ঘুম যেন ভূলে গেছে, বাড়ী ফিরতে চায় না। নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন মোড়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ চেক পোষ্ট বসিয়েছে যাতে পাকিস্তানীরা কোন সম্পদ পাচার করতে না পারে। স্বেচ্ছাসেবকলীগ দেওভোগ ন্যাশনাল ক্লাবের পিছনের মাঠে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। সময় পার হয়ে রাত বাড়তে লাগলো হঠাৎ খবর এলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাকিস্তানী সেনারা ট্যাঙ্ক ও অত্যাধুনিক অস্ত্রনিয়ে ঢাকাবাসীর উপর ইতিহাসের জঘন্যতম আক্রমণ করেছে। প্রতিবাদে রহমতউল্লাহ ক্লাবের সামনে জনতা গর্জে উঠল। শুরু হয় বুক ফাটা স্লোগান এবং মিছিল। সন্ধ্যায় মিছিল শেষে যারা ঘরে ফিরেছিলেন মিছিলের আওয়াজে তারা অনেকেই আবার ফিরে এলো মিছিলে। ঢাকার আকাশের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ছে আগুনের গোলা আর বিকট শব্দ। জানা গেল পাক সেনারা বঙ্গবন্ধুকে তার ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করেছে। তখন টেলিফোন যোগাযোগ খুবই সীমিত। অনেকে আত্মীয় স্বজনদের খোঁজ খবর নেওয়ার জন্য ছুটাছুটি করছে। শহরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে আতংক আর উৎকন্ঠা। মিছিল শেষে নারায়ণগঞ্জের সংগ্রামী জনতা ঘরে না ফিরে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছে। আমরা জনতাসহ নারায়ণগঞ্জ রেল স্টেশন থেকে মালগাড়ির কয়েকটি বগি ঠেলে এনে ১নং ও ২নং রেলগেটের রেললাইনের উপর রেখে দিলাম। রহমত উল্লাহ্ ক্লাবে বসে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে নারায়ণগঞ্জ প্রবেশে সশস্ত্র প্রতিরোধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করলো। ঢাকা- নারায়ণগঞ্জ রাস্তায় গাছ ফেলে রাস্তা কেটে ব্যারিকেড স্থাপন ও রেললাইন বিভিন্ন স্থানে উপড়ে ফেলা সহ রাত থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু হলো। এদিকে নাগবাড়ীস্থ ডিএসএস ক্লাবের মাঠে রাইফেল ও বন্দুক চালানো এবং বোতল ককটেল বানানোর সরঞ্জাম নিয়ে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম ও যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। শহরবাসীর মধ্যে যাদের নিকট আগ্নেয়াস্ত্র ছিল কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাষ্ট, র‌্যালী ব্রাদার্স, রাইফেল ক্লাব সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিগতসহ অধিকাংশ অস্ত্র ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সংগ্রহ করেছে। প্রায় ৩০০ তরুণ সংগ্রাম পরিষদের সাথে প্রতিরোধে অংশ গ্রহণে প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। ২৬ মার্চ ভোরে সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নারায়ণগঞ্জ মহকুমা (এস.ডি.ও) মালখানার অস্ত্র লুন্ঠন করা হয়।
প্রতিরোধঃ ২৬ মার্চ দুপুর থেকে (১) মাসদাইর কবরস্থান ও শ্মশান এলাকায়ঃ সিরাজুল ইসলাম, শফিউদ্দিন সারোয়ার বাবু, আব্দুস সাত্তার মরণ, খোরশেদ আলম দুদু, মীর শহীদুল্লা, জয়নাল আবেদীন টুলু, মনসুর আহাম্মদ, মোঃ সামসুদ্দিন, আজহার হোসেন ও সাংবাদিক কামরুজ্জামান এর নেতৃত্বে অসংখ্য সংগ্রামী জনতা (২) মাসদাইর জামতলা রাস্তার পশ্চিম ও দক্ষিণ পার্শ্বে ঃ আব্দুস সাত্তার, মোঃ জানে আলম, শরীফুল আশরাফ, সাহাবুদ্দিন আহম্মেদ, মোহর আলী চৌধুরী, আঃ আউয়াল মিলন মুন্সীগঞ্জের ছাত্রনেতা মোঃ আনিস ও মোঃ বাবুলের নেতৃত্বে অসংখ্য সংগ্রামী জনতা (৩) তোলারাম কলেজ সংলগ্ন চাষাঢ়া কুন্ডবাড়ী এলাকায়ঃ মোঃ মনিরুল ইসলাম, ফয়েজুর রহমান, মোঃ শাহ্জাহান, এম.এ. আউয়াল, মোঃ ওবায়েদউল্লাহ, আব্দুল মোতালিব, শরফুদ্দিন রবি, খবির আহম্মেদ, আঃ রাশেদ, সামছুল ইসলাম ভূঞা, তমিজউদ্দিন রিজভী, এনায়েত উল্লাহ, আঃ গফুর, নূর উদ্দিন আহমেদ, শহিদ বাঙ্গালী ও আব্দুল হামিদ পোকন এর নেতৃত্বে, অবসর ও ছুটিতে থাকা সেনা, ইপিআর, পুলিশ এবং আনসার সদস্যসহ অসংখ্য ছাত্র নেতা, কর্মী ও আশে পাশের সাহসী জনতা তীর-ধনুক, বল্লমসহ উল্লেখিত তিনভাগে পাক হানাদার বাহিনীকে নারায়ণগঞ্জ প্রবেশে প্রতিরোধ করার জন্য সশস্ত্র অবস্থান গ্রহন করে। কাঁদতে কাঁদতে ঢাকা থেকে আসা অসংখ্য মানুষ জানায় গত রাত থেকে পাকবাহিনী ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলসমূহে, ই.পি.আর হেড কোয়ার্টার পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ ঢাকা শহরে হাজার হাজার মানুষকে পাখির মত গুলি করে হত্যা, অগ্নি সংযোগ, ধর্ষণ ও লুটপাট করছে। ঢাকা শহরে লাখ লাখ নারী-পুরুষ, শিশু ভয়ে যে-যেভাবে পারছে গ্রামের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ঢাকায় পাকবাহিনীর আক্রমণের বর্বরতা শুনে নারায়ণগঞ্জ শহরবাসী শহর ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ২৬ মার্চ সন্ধ্যা রাতেই জানা গেল পাক বাহিনী ঢাকা থেকে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে পোস্তগোলা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে আসার পথে পাকবাহিনী রাস্তার ব্যারিকেড অপসারণ করছে, ওদের ভাষায় বাঙ্গালীদের অকথ্য গালিগালাজ করছে, এলোপাতাড়ি ব্রাশ ফায়ার করে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করছে এবং আশপাশের বাড়ি ঘরে অগ্নি সংযোগ করছে। ২৭ মার্চ সকালের মধ্যে পাকবাহিনী ফতুল্লায় এসে পৌঁছেছে এ খবর নারায়ণগঞ্জে প্রতিরোধ বাহিনীর নিকট দ্রুত গতিতে চলে আসে। প্রতিরোধ বাহিনীও প্রস্তুত। প্রথমে একটি সাদা ট্যাক্সি এবং পেছনে একটি সামরিক যানে করে ধীরগতিতে পাকবাহিনী নারায়ণগঞ্জ প্রবেশের সূচনা করে। পাকবাহিনী নারায়ণগঞ্জ পঞ্চবটি সড়কে শ্মশানের পশ্চিমে ব্রীজের উপর আসতেই প্রতিরোধ বাহিনীর রাইফেল, বন্দুক, পিস্তল ও বোতল ককটেল গর্জে উঠে। পাকবাহিনী মূহূর্তের মধ্যে গাড়ি থেকে লাফিয়ে রাস্তায় শুয়ে বৃষ্টির মত মেশিনগানের গুলি ও ব্রাশ ফায়ার করতে থাকে। ক্ষনিকের মধ্যে পাক বাহিনীর সাথে যুক্ত হয় ভারী অস্ত্র সহ আরো অনেক সৈন্য। বিশ্বের সেরা পাক বাহিনীর সাথে আমাদের প্রতিরোধ বাহিনী রাইফেল, বন্দুক, পিস্তল ও বোতল ককটেল দিয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে ২৭ মার্চ সকাল ১০ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত পাক বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়। পাক বাহিনীর গুলিতে নিহত হয় সাত্তার জুট মিল মালিকের ছেলে তৌহিদ এবং জামতলা নিবাসী ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার ড্রাইভার ও ড্রাইভারের ভাই এবং আহত হয় ছাত্রনেতা খোরশেদ আলম দুদুসহ অনেকেই। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এই প্রতিরোধের ফলে নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ নারী, পুরুষ, শিশু তাড়াহুড়া ও ছুটাছুটির মাধ্যমে আশপাশের এলাকায় নিরাপদে চলে যেতে সক্ষম হয়। এভাবেই আবারও ইতিহাস সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ৭১ এর অসহযোগ এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনে গৌরব উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে নারায়ণগঞ্জবাসী। পরবর্তীতে শুরু হয় স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত, দু’লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বাঙ্গালীর মহান স্বাধীনতার বিজয়। জয় বাংলা। ###
লিখক
মোহর আলী চৌধুরী
মুক্তিযোদ্ধা ও সদস্য স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ