রাজউকের মতবিনিময় সভা ত্যাগ করলেন ক্ষুব্ধ নাগরিকরা : ব্যাপক দূর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ

64

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম: নিজেই সময় দিয়ে নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় আসেননি রাজউকের চেয়ারম্যান। রাজউক চেয়ারম্যানের এ আচরনে ক্ষুব্ধ নাগরিকরা মতবিমিয় সভা ত্যাগ করেন। তারা এসময় রাজউকের বিরুদ্ধে দূর্নীতি, অনিয়ম ও প্ল্যান পাশ করার জন্য অনৈতিক বানিজ্যের অভিযোগ আনেন। পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পরবর্তীতে রাজউক চেয়ারম্যানের সাথে আলোচনা করে এ সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষনা দেন। সভায় মেয়র আরো বলেন, নারায়ণগঞ্জের কতিপয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজউকে বর্তমানে কর্মরত নারায়ণগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিঞা পরস্পরের যোগসাজশে রাজউকের অব্যবহৃত প্লট বিক্রির পায়তারা করছেন।
‘রাজধানী উন্নয়ন কতৃপক্ষ (রাজউক) ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (২০১৬-২০৩৫) এর বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনসাধারনের মতবিনিময় সভা’ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে দশটায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সভা কক্ষে হওয়ার কথা ছিলো। সিটি কর্পোরেশন এ সভার আয়োজন করে। সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিলো রাজউক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুর রহমানের। রাজউক চেয়ারম্যানের আসার ঘোষনার কারনে বিশিষ্ট শিক্ষাব্যাক্তিত্ব কাশেম জামাল, নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম, নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি এডভোকেট এ বি সিদ্দিক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারন সম্পাদক তারেক বাবু, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, অসিতবরন বিশ্বাস, হান্নান সরকার, মিনুয়ারা বেগম, বিভা হাসানসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরসহ নগরীর বিশিষ্ট নাগরিকরা সিটি কর্পোরেশনের সভাকক্ষে নির্ধারিত সময়ের আগেই উপস্থিত হন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘন্টা পর রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম প্রধানসহ রাজউক কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হন। উপস্থিত হয়ে সিরাজুল ইসলাম প্রধান জানান, মন্ত্রী মহোদয় চেয়ারম্যান সাহেবকে ডেকে নেয়ায় তিনি এ সভায় আসতে পারবেন না। তিনি এরপর সভা শুরুর চেষ্টা করেন।
কিন্তু এসময় বক্তব্য রেখে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি এডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, রাজউক নারায়ণগঞ্জবাসির অধিগ্রহন করা জমি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নারায়ণগঞ্জবাসির উন্নয়নের এক বঙ্গবন্ধু সড়ক করা ছাড়া আর কিছুই করেনি। উন্নয়নের কথা বলে জমি নিয়ে তারা সে জমি বিক্রি করে এখন ব্যবসা করছে। আজকে নারায়ণগঞ্জের বিশিষ্ট জনদের ডেকে আবার না এসে তিনি যে আচরন করেছেন তাতে আমরা প্রচন্ড ক্ষুব্ধ। তিনি না আসলে এ সভা হতে পারেনা। নারায়ণগঞ্জবাসির সম্পদ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার পাই পাই হিসাব নারায়ণগঞ্জবাসি আদায় করে নেবে।
কাউন্সিলর শফিউদ্দিন প্রধান বলেন, রাজউকের কাছ থেকে একটি প্ল্যান আনতে গেলে কমপক্ষে দেড় লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। রাজউকের নকশা বহির্ভূত কোনো নির্মাণের কথা তাদের জানালে তারা ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো ঘুষ নিয়ে চলে যায়। তারা দায়িত্ব নিয়ে রেখেছে। কিন্তু দায়িত্ব পালন করছে না। দায়িত্ব পালন করতে না পারলে দায়িত্ব ছেড়ে দেন। জোর করে ধরে রেখেছেন কেন।
কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ বলেন, রাজউক চেয়ারম্যান আসবেন বলে নির্ধারিত সময়ের আগে এখানে এসে বসে আছি। তার কাছে আমাদের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু তিনি না এসে নারায়ণগঞ্জবাসিকে অপমান করেছেন। তিনি মিথ্যা অযুহাতে এখানে আসেননি। তার দূর্নীতি অনিয়মের অভিযোগ শুনতে হবে বলে তিনি এখানে আসেননি। তিনি বলেন, কোটি কোটি টাকা খরচ করে ড্যাপ হচ্ছে। কিন্তু এ ড্যাপ ধরে রাখার জন্য আপনাদের কি জনবল আছে ? যদি না থাকে তাহলে তা ডিএনডি’র মতো প্রকল্পে পরিণত হবে। জলাবদ্ধতায়, যানজটে, সবুজহীনতায়, জলহীনতা সমস্যায় মানুষ পড়বে। কিন্তু অভিযোগ বলার জন্য, সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো কতৃপক্ষ থাকবে না। তিনি বলেন, আমার বাসায় প্ল্যান আমি কাউন্সিলর হওয়ার কারনে সাত হাজার টাকায় রাজউক থেকে পাশ করিয়েছি আর আমার ভাইয়ের বাসার প্ল্যান এক লাখ চল্লিশ হাজার টাকা নিয়েছে। রাজউক নারায়ণগঞ্জের প্ল্যান দিতে গিয়ে কোটি কোটি টাকা ঘুষ হাতিয়ে নিয়েছে। রাজউক ভবনে গেলে মনে হয় পিয়ন আর চেয়ারম্যানের ক্ষমতা সেখানে সমান। তিনি বলে, ছয় তলা পর্যন্ত প্ল্যান পাশের ক্ষমতা নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের হাতে অর্পণ করা প্রয়োজন। এতে মানুষ হয়রানী থেকে বাঁচবে।
ক্ষুব্ধ এ হৈ চৈ এর সময় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও সভার সভাপতি ডাঃ সেলিনা হায়াৎ আইভী সভাস্থলে ছিলেন না। পৌনে বারোটায় তিনি সভা কক্ষে প্রবেশ করে সবাইকে শান্ত করেন। এসময় তিনি নাগরিকদের ক্ষোভের সাথে একমত পোষন করে বলেন, আজকের সভা আমরা ৯ আগষ্ট করতে চেয়েছিলাম। রাজউক চেয়ারম্যান-ই আমাকে ৮ তারিখ সময় দিয়েছেন। তার সময় অনুযায়ী-ই সিটি কর্পোরেশন সভার চিঠি দিয়েছে। আমার ইচ্ছা ছিলো রাজউক ড্যাপ সম্পর্কে বলতে চায় আমরা সেসম্পর্কে শুনবো। এবং আমাদের সমস্যাগুলি তাকে বলবো। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের কতিপয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজউকে বর্তমানে কর্মরত নারায়ণগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান মিঞা পরস্পরের যোগসাজশে রাজউকের অব্যবহৃত প্লট বিক্রির পায়তারা করছেন। ড্যাপ-এ নারায়ণগঞ্জের বালুর মাঠের যে স্থানটি কার পার্কিংয়ের জায়গা হিসেবে নির্ধারিত সে স্থানটি রাজউক পল্ট করে বিক্রির জন্য সম্প্রতি বিজ্ঞাপন দিয়েছে। আমরা এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টের শরণাপন্ন হলে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আদালতের প্রতি সম্মান থাকলে তারা এ বিক্রি বন্ধ করবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের জমিতে রাজউকের নির্মাণ করা পাঁচটি মার্কেট মন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশের পরেও সিটি কর্পোরেশন এখনো ফেরৎ পায়নি। তিনি বলেন, ওয়ান ইলেভেনের পরে আর্মি ব্যাকড সরকার থাকার সময়েও নারায়ণগঞ্জবাসি আন্দোলন করে রাজউকের এ প্লট বিক্রি ঠেকিয়ে দিয়েছিলো। তখন রাজউকের দায়িত্বে থাকা সেনা কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন, আমাদের সময়ে এটি বিক্রি হবেনা। কিন্তু জনপ্রতিনিধিদের সময়েই এটি বিক্রি হবে। দুঃজনকভাবে আজকে সে পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা রাজউকের বর্তমান চেয়ারম্যানকে অন্য চেয়ারম্যানদের মতো মনে করিনা। আমরা শুনেছি তিনি একটিভ, ভালো মানুষ। আমরা তার সাথে আবার যোগাযোগ করবো। পরে আবার মতবিনিময় সভায় বসার চেষ্টা করবো। #