মেরিন ডিপ্লোমাধারীদের সিডিসি না দেয়ার অদ্ভূত সিদ্ধান্ত সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের

1532

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম: মেরিন টেকনোলজির উপরে ডিপ্লোমা পাশ করার পরে ছাত্র-ছাত্রীদের দেয়া হতো সিডিসি নামের একটি সনদ। যার মাধ্যমে তারা বিদেশী জাহাজে চাকরি পেতো। কিন্তু সম্প্রতি সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর সরকারি গেজেট লঙ্ঘন করে একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে এ সনদ সরাসরি প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। সিডিসি সনদ প্রাপ্তির জন্য ক্লাস-৫ পরীক্ষা পাশের পরেও এখন পাচ বছরের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হবে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের ফলে মেরিন টেকনোলজিতে পড়াশোনা করা ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে হতাশা। তারা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে এই দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমান কমে যাবে। অন্যদিকে অবৈধভাবে সিডিসি প্রদানের জন্য দূর্নীতির ব্যাপক সূযোগ তৈরী হবে।
নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইনষ্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজির (বিআইএমটি) এর মেরিন ডিপ্লোমা চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ রাজিব শেখ, আবীর হাসান, নূর তাজ আরা জানান, বাংলাদেশে মেরিন টেকনোলজির ছয়টি সরকারি ও ষাটটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর প্রায় তিনহাজার ছাত্র-ছাত্রী মেরিন টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে। এ কোর্স সম্পন্ন করার পর তারা দেশীয় জাহাজে বাধ্যতামূলকভাবে এক বছর চাকরি করে। আগে ছাত্র-ছাত্রীরা মেরিন টোকনোলজির উপরে ডিপ্লোমা শেষ করলেই সিডিসি সনদ পেয়ে যেতো। যার মাধ্যমে তারা বিদেশী জাহাজে চাকরি করতে পারতেন। ২০১১ এর ১৩ ফেব্রোয়ারী এ সনদ পাওয়ার জন্য ‘ক্লাস-৫’ নামের একটি পরীক্ষা চালু করে এ সনদ পাওয়া কঠিন করে দেয় সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর। তবে ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের যোগ্যতায় এ বাধা অতিক্রম করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই এতদিন ‘সিডিসি’ সনদ পেতো। কিন্তু এবার এ সনদ সরাসরি প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে অধিদপ্তর।
গত ৩ রা মার্চ সমুদ্র পরিবহন অধিপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এম জাকিউর রহমান ভূইয়া সাক্ষরিত এক অফিস আদেশের মাধ্যমে জানানো হয়, সিডিসি পেয়ে বানিজ্যিক জাহাজে যোগদান করায় কোষ্টাল জাহাজে নিয়োগের জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। এ কারনে ক্লাস-৪ এবং ক্লাস-৫ পরীক্ষায় উত্তীর্নদের সিডিসি পাওয়ার জন্য অধিদপ্তরের অনাপত্তিপত্র জারি করা হবেনা মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়েছে। তবে ক্লাস-৪ সনদ পাওয়ার পাচ বছর কোষ্টাল জাহাজে চাকুরির পর এনওসি প্রদানের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ক্লাস-৫ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়ার পর এক বছর চাকরির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। এরপর আরেকটি পরীক্ষা দিলে ক্লাস-৪ উত্তীর্ন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে গন্য করা হয়।
বিআইএমটি’র সদ্য পাশ করা ছাত্র মারুফ হাসান ও তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ রিয়ন আলি জানান, আগে যেখানে ক্লাস-৫ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হলেই সিডিসি সনদ দেয়া হতো এখন সেখানে এ পরীক্ষা উত্তীর্ণের পর আরো পাচ বছর জাহাজে চাকরি করতে হবে। এরপর সিডিসি’র জন্য আবেদন করা যাবে। তবে সিডিসি সনদ দেয়া হবে কি হবে না তা পুরোই নির্ভর করবে অধিদপ্তরের উর্ধ¦র্তন কর্মকর্তাদের মর্জির উপর। মারুফ ও রিয়ন আরো জানান, ফলে একদিকে বিদেশি জাহাজে চাকরির সূযোগ কমে যাবে। এ খাতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পরিমান কমে যাবে। অন্যদিকে চোরাপথে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর থেকে সিডিসি নেয়ার প্রবণতা বাড়বে। অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের জন্য তৈরী হবে দূর্নীতির সূযোগ।
বিআইএমটির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সবুজ হোসেন জানান, কোষ্টাল ও নিয়ার কোষ্টাল জাহাজে লোকবল সংকটের অযুহাত দেখিয়ে সিডিসি দেয়া বন্ধ করা হয়েছে। নিয়ার কোষ্টাল বলতে স্থানীয়ভাবে চলাচলকারি লাইটারেজ জাহাজ ও কোষ্টাল জাহাজ বলতে একটি বা দুইটি দেশের মধ্যে চলাচলকারি জাহাজকে বুঝায়। কিন্তু কোষ্টাল জাহাজে লোকবলের সংকট তো নেই-ই সেখানে প্রয়োজনের তুলনায় লোকজন বেশি আছে। নিয়ার কোষ্টাল অর্থাৎ তেলের ট্যাংকার, পণ্যবাহী জাহাজগুলিতে অষ্টম শ্রেণী-নবম শ্রেনী উত্তীর্ণদের মালিকরা চাকরি দিতে আগ্রহী। কারন এদের বেতন কম দেয়া যায়। ডিপ্লোমাধারিদের নুন্যতম বেতনটুকুও মালিকরা দিতে আগ্রহী না। অন্যদিকে প্রতিবছর মেরিন টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা নিয়ে তিন হাজার ছাত্র-ছাত্রী বের হচ্ছে। অথচ এসব নিয়ার কোষ্টাল জাহাজে প্রতিবছর চাকরির সূযোগ রয়েছে মাত্র তিনশ জনের।
২০১১ সালের ১৩ ফেব্রোয়ারী জারি করা নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ের মেরিন টেকনোলজির ডিপ্লোমা সংক্রান্ত গেজেট নোটিফিকেশনের সাত ধারায় বলা হয়েছে, এই বিধিমালার অধীন অনুষ্ঠিত যোগ্যতা সনদায়ন পরীক্ষাসমূহে উত্তীর্ন হবার পর বিধিমালার অন্যান্য শর্ত পূরন সাপেক্ষে প্রত্যেক প্রার্থীকে পরিশিষ্ট-৫ এ উল্লিখিত ফরমে যোগ্যতা সনদ ইস্যু করা হবে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ের এ গেজেট লঙ্ঘন করে সিডিসি সনদ না দেয়া সংক্রান্ত উল্লেখিত অফিস আদেশ জারি করেছে বলে ছাত্র-ছাত্রীরা অভিযোগ করেন।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বিআইএমটি’র ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শরীফা সুলতানা বলেন, সিডিসি দেয়া হবেনা অফিস আদেশে সরাসরি এমন বলা হয়নি। আরো পাচ বছরের অভিজ্ঞতার পর সিডিসি দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলা হয়েছে। এতে বেকারত্ব বাড়বে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হতাশা বাড়বে। আমি বিষয়টি আমাদের মন্ত্রনালয়ে জানিয়েছি। তারা হয়তো আলোচনা করে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবেন।
এ ব্যাপারে কথা বলতে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর এম জাকিউর রহমান ভূইয়ার অফিসের ল্যান্ডফোনে (৯৫১৩৩০৫) ফোন করা হলে তিনি মিটিংয়ে ব্যাস্ত আছেন তাই কথা বলতে পারবেন না বলে জানানো হয়।  #