ভেজাল প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি: মেয়র আইভী (ভিডিও সহ)

362

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম: “খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন গণসচেতনতা ও সমন্বিত উদ্যোগ” শীর্ষক গোল টেবিল বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডাঃ সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেছেন, ভেজাল প্রতিরোধে সচেতনতার চাইতে কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি। খাবার নিয়ে আমরা যথেষ্ট সচেতন। কিন্তু আমরা বিশুদ্ধ খাবার পাচ্ছিনা। কারন খাদ্যে ভেজালকারিরা অনেক শক্তিশালী। ক্ষমতাবান। এদেশে এখন অন্যায়ই ন্যায়ে পরিণত হয়ে গেছে। ম্যাজিষ্ট্রেট রোকন উদদৌলা ভেজাল বিরোধী অভিযান চালিয়ে সাড়াদেশে আইডল হয়েছে। প্রশাসনের আরো অনেকেই রোকন উদদৌলা হওয়ার মতো সাহস দেখাতে চায়। কিন্তু তারা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের বা আমাদের সহযোগিতা পায়না। তিনি বলেন, সাড়াদেশে রাস্তার পাড়ে সরকারি জায়গায় বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ময়লা ফেললেও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনকে এ কারনে জরিমানা করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। নারায়ণগঞ্জের আর কোথাও পরিবেশ অধিদপ্তরকে আমরা জরিমানা করতে দেখিনা। রাস্তার পারে ময়লা ফেলতে হয় কারন সাড়াদেশেই আলাদা ডাম্পিং স্পট নেই। আমরা তাদের আহ্বান জানাবো শীতলক্ষ্যা, বুড়িগংগা যারা দূষন করছে, পলিথিন দিয়ে যারা নারায়ণগঞ্জ ভরে ফেলছে পরিবেশ অধিদপ্তর যেন তাদের কঠোরভাবে জরিমানা করেন।
এদিকে পরিবেশের বিষয়ে বলতে গিয়ে ডা. আইভী বলেন, পরিবেশ রক্ষায় যেখানে জরিমানা করার কথা সেখানে জরিমান করা হয় না কিন্তু দু:খের বিষয় অন্য একজনের প্ররোচনায় পরিবেশ দূষনের দায় এনে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনকে দুই লাখ টাকা জরিমান করা হয়। দেশের  এমন কোন রাস্তা নেই যেখানে ময়লা ফেলা না হয়। কারন ডাম্পিংয়ের জায়গা নেই। কাজেই মানুষ রাস্তার পাশে ময়লা ফেলে। এই উদারন টেনে আইভী বলে প্রশাসনের এ ধরনের তৎপরতা যদি ভাল উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয় তাহলে সুফল আসতে পারে। ভেজাল খ্যাদ্য পরিহার করতে হলে আইনে প্রয়োগ যতদিন নিশ্চিত না হবে, শাস্তির বিধান যত ক্ষন প্রয়োগ না করবেন ততদিন এ দেশের মানুষ এ অন্যায় গুলো কওে যাবে।
শনিবার সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের হানিফ খান মিলনায়তনে এ গোল টেবিল বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। ওয়ার্ল্ড ওয়াচ সোস্যাইটি এবং নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটি যৌথ ভাবে এই গোল টেবিলে বৈঠকের আয়োজন করে।
গোল টেবিল বৈঠকে অংশ নেওয়া অতিথিবৃন্দ খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে সচেতনাতার কোন বিকল্প নেই বলে মতামত ব্যক্ত করেন। তবে জনসচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের নজরদারির উপরও গুরুত্বারোপ করেন।
বৈঠকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভী বলেন, নারায়ণগঞ্জে নতুন এসপি ডিসি আসলে প্রথমে অনেক কাজ করেন। কিন্তু কেন জানি তারা ধীরে ধীরে স্লো হয়ে যায়। কাদের কারনে কিভাবে এ ঘটনা ঘটে সেদিকে যেতে চাইনা।
তিনি বলেন, আমি অনেক সত্য কথা বলতে গেলে বলা হয় সরকারের বিরুদ্ধে বলছি। আসলে সরকার তো আমরাই। আমাদের ভুল ত্রুটি নিজেরই তুলে ধরি এবং আত্মসমালোচনা করি। এতে নিজেদের কাজের গতি বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু কেউ কেউ রাজনৈতিক কারনে সেটাকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যায়। যদিও আমি তারপরও সত্য কথা বলি। জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ সালের যে রুপরেখা দিয়েছেন সে রুপরেখা বাস্তবায়নে আমাদেরও কাজ করতে হবে। সেখানে সকলের সহযোগীতা প্রয়োজন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক আনিছুর রহমান মিঞা বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে আজ থেকে ফরমালিন ও ভেজালমুক্ত মাছ পাওয়া যাবে বলে ঘোষণা করলাম। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন সব সময় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে থাকে। নারায়ণগঞ্জ শহরের বড় বড় রেঁস্তোরা গুলো মনিটরিং করছে। দীর্ঘদিন মনিটরিং করে সেখানে পাচকদের পোশাকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। টয়লেট থেকে ফিরে যেন হাত ভাল করে ধুয়ে নেয় সে বিষয়ে জোর দেয়া হয়েছে। পশু জবাইয়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বানানোর কাজ চলছে।  আগে যেখানে ৮ হাজার মেট্রিক টন ফরমালিন ব্যবহার হতো এখন সেখানে ১০০-১৫০ টন ফরমালিন ব্যবহৃত হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার ড. খন্দকার মহিদ উদ্দীন বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের যখন প্রয়োজন হবে তখনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সহযোগীতা করবে পুলিশ। কারণ পুলিশ সরাসরি খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে কাজ করতে পারবে না। এসবে জেলা প্রশাসন ও সিটিকর্পোরেশন কাজ করবে। সেখানে পুলিশ সহযোগীতা করতে পারবে।
রাজউকের পরিচালক (আইন) রোকনউদৌলা বলেন, সর্বক্ষেত্রে ভেজাল। এজন্য জনগণকেই সচেতন হতে হবে। যে আইন রয়েছে সে আইনটি যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আ.ব.ম. ফারুক বলেন, ভেজাল প্রতিরোধে আন্দোলনে যাওয়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আমাদের দেশে বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণের কোন আইন নেই। কারণ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভুল তথ্য তুলে ধরে মানুষকে প্রতারিত করছে। গুড়ো মরিচে যে রং ব্যবহার করা হয় সেই রং ১৯৬২ সালে সারাবিশ্বে নিষিদ্ধ করা হয়। অথচ এদেশে সেই রং ব্যবহার করা হচ্ছে। সেই রং এ ক্যান্সার হতে পারে। আর মানুষ কতটা নিচে নেমেছে ভাবতেও পারা যায়না। এখন ধনিয়ার গুড়োতে গরুর গোবর পাওয়া যায়। গোবর মিশিয়ে ধনিয়ার গুঁড়ো বানানো হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মহসীন হলের প্রভোস্ট ড. মোঃ নিজামুল হক ভূঁইয়া বলেন, প্রসবের ৬ মাস পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দিলেও আমাদের দেশে শিশুকে বাজারের দুধ খাওয়ানো হয়। আর চায়না মেলামাইন দিয়ে যে গুঁড়ো দুধ বাজারজাত করছে সে দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। মেলামাইনের দুধ দিয়ে আইসক্রীম, বিস্কুট, সব খাবারে দেয়া হচ্ছে। দেশে পচা গম জাহাজ ভরে নিয়ে আসা হয়েছে। সরকারকে কঠোর হতে হবে। এসব বিষয়ে জনগণকেও সচেতন হতে হবে। কনডেন্সড মিল্ক বলতে যা বিক্রি হচ্ছে তাতে কোন দুধ-ই নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাকিয়া পারভীন বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল শুধু মানবদেহে নয় প্রকৃতি ও মাটিকেও নষ্ট করে যাচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। কীটনাশক ব্যবহার, সার প্রয়োগে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। প্রাণী ধ্বংস হচ্ছে। তাই আমাদের নৈতিকতার উন্নতি দরকার। সচেতনতা আরো বাড়াতে হবে।
গোল টেবিল বৈঠকের সভাপতিত্ব করেছেন নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট এবি সিদ্দিক ও সঞ্চালনায় ছিলেন ওয়ার্ল্ড ওয়াচ সোসাইটির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লুৎফর রহমান। গোল টেবিলে বৈঠকে আরো বক্তব্য রাখেন নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, বাংলাদেশ ক্যামিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সাধারণ সম্পাদক এইচএম টুটুল, জেলা সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বি, নারায়ণগঞ্জ ট্যাক্সেস বারে এসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল দেওয়ান, নারায়ণগঞ্জ জেলা সিবিপি সভাপতি হাফিজুল ইসলাম, জেলা বাসদ সমন্বয়ক নিখিল দাস, হিমাংশু সাহা, জেলা সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল, নির্ভীকের জেলা সমন্বয়ক এটিএম কামাল, আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী সংগঠনের সভাপতি নুরউদ্দীন আহম্মেদ, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন মন্টু, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুমন মিয়া, ওয়ার্ল্ড ওয়াচ সোসাইটির মহাসচিব তরিকুল ইসলাম, নাগরিক কমিটির সহ-সভাপতি গাজী মোখলেছুর রহমান, পরিবেশ আন্দোলনের নেতা তারিক বাবু প্রমুখ।#

ভিডিওটি দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: