বিদ্যানিকেতন হাই স্কুল, প্রেক্ষাপটে এক অনন্য সামাজিক গল্প

562

মুক্ত কলাম-অধ্যাপক আ ব ম ফারুক :-আমি যখন ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তখন আমার বাবা এই এলাকায় একটি বাড়ি কিনলেন। আমরা চাষাড়ার ভাড়া বাসা থেকে এই এলাকায় নিজেদের বাড়িতে এলাম। ভাড়া বাসা থেকে নিজেদের বাড়ি। তার অনুভূতিটাই ছিল অন্যরকম এবং রোমাঞ্চকর। জায়গাটির নাম ছিল ‘ভুঁইয়ার বাগ’। আজ যেখানে এই বিদ্যানিকেতন হাই স্কুলটি দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে শুরু হয়ে পশ্চিমে যেতে থাকলে ভুঁইয়া বাড়ির ওপর দিয়ে আরো পশ্চিমে গেলে একটি বিরাট মাঠ পড়তো। সেটির পশ্চিম-উত্তর মাথায় ছিল ভারি সুন্দর একটি দিঘী, যার পূর্ব-দক্ষিণ কোণায় ছিল একটি বিরাট উঁচু তাল গাছ। এর পশ্চিম দিকে ছিল আরেকটি তাল গাছ। কবিতার বইয়ে পড়া তালদিঘীর মতোই সুন্দর ছিল দিঘীটা। এর পূর্ব পাড় দিয়ে উত্তর দিকে এগিয়ে পুনরায় দিঘীর উত্তর পাড় ধরে হেঁটে গেলে দিঘীর উত্তর-পশ্চিম কোণায় ছিল আমাদের নতুন কেনা বাড়িটা। দিঘীর উত্তর পাড়ের জায়গাটি ছিল খালি, যাকে মোটামুটি একটি ছোট মাঠই বলা যায়। দিঘীর পশ্চিম পাড় পুরোটা জুড়েই ছিল বিরাট খালি জায়গা, সেটাও একটা বিরাট মাঠের মতোই, তবে অনেক বড় বড় ছন গাছে ভর্তি, সাপও দেখা যেত মাঝেমধ্যে। সাপের ভয়ে লোকজন তাই দিঘীর পূর্ব আর উত্তর পাড় ধরেই যাওয়া-আসা করতো। বসতি বলতে ছিল কেবল দিঘীর দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম কোণায় আর পূর্ব পাড়ে।

ভুঁইয়া বাড়িতে ছিল বেশ কিছু ঘর। ডংকুদা, তাঁর এক পিসেমশাই গোপাল ডাক্তার, নিত্যপূজার জন্য একঘর ব্রাহ্মণ, আর কিছু গরিব আশ্রিতরা থাকতেন সেসব ঘরে। তার উত্তরে একটি বড় মজা পুকুর। তার উত্তরে ছিল বিশাল একটি বাগান, যার প্রায় পুরোটাই ছিল নানা রকমের অজ¯্র আম গাছে ভর্তি।

বাগানটির শুরুতেই ছিল বিরাট একটি কেয়া গাছের ঝোপ। কেয়া ফুলের গাছ যে এতবড় আর এর মোটা মোটা কান্ডগুলো সাপের মতো একেবেঁকে এত বড় জায়গা দখল করতে পারে তা আমার জানা ছিল না। এত বড় কেয়ার ঝোঁপ কেবল সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপের দক্ষিণের ছোট্ট দ্বীপটি ছাড়া আর কোথাও দেখিনি। বাগানটির পূর্ব দিকে বাঁশের ঝাড় ছিল দুটি, সেগুলোও ছিল প্রকান্ড। বাগানটিতে কোন যতœ ছিল না। ফলে এই সব কেয়া আম, কয়েকটি চালতা তেঁতুল হিজল আর শ্যাওড়া গাছ, অযতেœ বেড়ে ওঠা আগাছা, বেতের ঝোপ, কোথাও কোন ঝোপে লেগে থাকা আধো-অন্ধকার, সেই সাথে আগাছার গায়ে আর শেকড়ে লেগে থাকা বিভিন্ন সাপের খোলস — সব মিলিয়ে এই বাগানটির একটি আদিভৌতিক চেহারা ছিল। দিনের বেলা এই বিশাল অন্ধকারাচ্ছন্ন গা ছম্ছম্ করা বাগানটিতে আমরা একা কখনোই যেতাম না। আর বিকেলের পর হাজার টাকা দিলেও কয়েকজন মিলেও না। এর পূবে ছিল একটা খাল। তার পূবের জায়গাটিতেই আজকের বিদ্যানিকেতন হাই স্কুল। এই স্কুলের জায়গাটি থেকে বাগান মাঠ দিঘী হয়ে আমাদের বাড়ি পর্যন্ত পুরো এলাকাটিই ‘ভুঁইয়ার বাগ’ নামে পরিচিত ছিল।

ভুঁইয়ার বাগে আসা-যাওয়ার রাস্তাটা ছিল খুবই খারাপ। লক্ষ্মীনারায়ণ আখড়া পর্যন্ত পাকা রাস্তা ছিল। আমরা সেখানে রিক্সা থেকে নেমে জিওস দিঘীর প্রথমে পূর্ব পাড় তারপর উত্তর পাড় ধরে হেঁটে ভুঁইয়ার বাগে আসতাম। উত্তর পাড়ের পুরো রাস্তাটা ছিল খুবই সংকীর্ণ একটা পায়ে চলা পথের মতো। কাঁচা সেই রাস্তার মাটি ছিল শুকনো অবস্থায় পাথরের মতো শক্ত আর সামান্য একটু বৃষ্টি হলেই মহাপিচ্ছিল। কীযে অবর্ণনীয় কষ্ট হতো বর্ষাকালে। জিওস দিঘীর উত্তর ও পশ্চিম পাড়ে ছিল বস্তির মতো অসংখ্য ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি। প্রচুর গরিব ও নি¤œআয়ের মানুষের আবাস ছিল সেগুলো। তাদেরসহ ভুঁইয়ার বাগের সবাইকে এই তথাকথিত রাস্তাটা ব্যবহার করতে হতো বাধ্য হয়ে, কারণ আর কোন রাস্তা ছিল না। আমরা কতবার যে এখানে আছাড় খেয়েছি তার হিসেব নেই। দিঘীটার উত্তর-পশ্চিম কোণায় ছিল একটা বড় অশ্শত্থ গাছ আর একটি প্রাচীন মন্দির। এটি পেরিয়ে এলে পাওয়া যেত প্রকা- এক বটগাছ। এখান থেকে বায়ে সোজা গেলেই ভুঁইয়া বাড়ি। ভুঁইয়া বাড়ি যাওয়ার পথে হাতের ডানপাশে ছিল পাগলাদাদের বাড়ি, যা আজকের বিদ্যানিকেতন হাই স্কুল।

পাগলাদা আসলে পাগল ছিলেন না। তাঁর আসল নাম ছিল হৃষিকেশ সাহা কিংবা ঘোষ। ভুঁইয়া বাড়ির আর কিছু বাড়িঘর বাদে ভুঁইয়ার বাগের অধিকাংশ জায়গার মালিক ছিলেন সন্তোষ কুমার ভৌমিক, যিনি পরিচিত ছিলেন ডংকু ভুঁইয়া নামে। তাঁকে আমরা ডাকতাম ডংকুদা নামে, যদিও তিনি ছিলেন আমার বাবার চাইতেও বয়সে বড়। এই ডংকুদা হৃষিকেশদাকে, যিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী একজন নিপাট ভদ্রলোক, সারাক্ষণ বাড়ির ভেতর বসে পড়তেন এবং খেলাধুলাতেও আসতেন না বলে, আদর আর ঠাট্টা করে ‘পাগলা’ নামে ডাকতেন। তিনি অর্থাৎ হৃষিকেশদা মানুষের সাথে খুব একটা মিশতেন না। কিন্তু দেখা হলে হাসি দিয়ে কুশল জিজ্ঞেস করতেন। লেখাপড়ার খোঁজখবর নিতেন। পাড়ার কেউ রেজাল্ট ভালো করেছে শুনলে খুশি হতেন, উল্টোটা শুনলে দুঃখ করতেন। তবে উভয়কেই খুব উৎসাহ দিতেন। আমার স্কুল-কলেজের বইয়ের চাইতে গল্পের বইয়ের প্রতি ঝোঁক ছিল বিধায় আমি কার ঘরে কেমন বই আছে খবর রাখার চেষ্টা করতাম, যাতে সময়মতো ধার নেওয়া যায়। ছোটবেলায় একদিন তাঁর ঘরে গিয়ে দেখি সব বিদ্ঘুটে নামের ইংরেজি-বাংলা অনেক বই। গল্পের বই তেমন নেই। যা আছে সেগুলো আমার পড়া আছে। একটি বই পেলাম শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’। ধার নিতে চাইলাম। দিলেন না। বললেন, ‘এই বয়সে এগুলো পড়তে নেই’। আমি বললাম, ‘বুঝতে পারবো’। তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি বুঝলাম তিনি নিশ্চয়ই ভাবছেন আমি অনেক পেকে গেছি। খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। তিনি বললেন, ‘আরো বড় হলে পড়বে, এখন নাড়– খাও’। ক’দিন আগেই লক্ষ্মী পূজা ছিল। নাড়– আর পানি খেয়ে চলে এলাম। আমার পাকামো বা ধৃষ্টতায় তিনি যদি রাগ করতেন, বেঁচে যেতাম। রাগ না করে বরং আদর করে নাড়– খাওয়ানোতেই হলো সমস্যা। এরপর আর লজ্জায় ওদিকে যাইনি। হৃষিকেশদা পরে কোথায় যেন চাকরি করতেন। তখনো তিনি ছিলেন তেমনি আশ্চর্য চুপচাপ।

ভুঁইয়া বাড়ির মালিক সন্তোষ কুমার ভৌমিক বা ডংকু ভুঁইয়ারা ছিলেন দেওভোগ নাগ বাড়ির মালিক। তাঁরা ছিলেন জমিদার পরিবার। প্রচুর জায়গা-জমি ছিল তাঁদের। ডংকুদার পরিবারের সবাই ভারত চলে গিয়েছিলেন ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পরপরই। তিনি একা এখানে থাকতেন। মানসিকভাবে তিনিও চলে যাওয়াই স্থির করেছিলেন। জায়গা-জমি বিক্রি করছিলেন ধীরে ধীরে। দীর্ঘদেহী সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। সাত্ত্বিক জীবনযাপন করতেন। প্রতিদিন ভোরে যোগ-ব্যায়াম আর প্রচুর ডন-বৈঠক করে দিঘীতে অনেকক্ষণ ধরে গোছল করতেন। তীব্র শীতের সময়ও তার ব্যতিক্রম হতো না। তিনি সর্বক্ষণ পাড়ার ছেলেমেয়েদের নিয়ে মেতে থাকতেন। তাঁদের খেলাধুলার জন্য নানারকম ব্যবস্থা রেখেছিলেন। ভুঁইয়া বাড়িতে ঢুকতেই হাতের বায়ে ছিল তাঁর বৈঠকঘর কাম ব্যায়ামাগার। সেখানে নিয়মিত আসতেন দেওভোগের বশিরদা ও জিওস দিঘীর উত্তর পাড়ের শৈলেসদা। দু’জনেই ছিলেন ডংকুদার মতোই সুঠাম স্বাস্থ্যের। বশিরদার পেশা কী ছিল জানতাম না। তবে শৈলেসদা চাকরি করতেন নারায়ণগঞ্জ ইউরোপিয়ান ক্লাবে, বর্তমানে যার নাম নারায়ণগঞ্জ ক্লাব। তারা তিনজনই চাইতেন তাঁদের মতো আমরাও যেন সুস্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম করি। কিন্তু সে গুঁড়ে বালি। তবে ব্যায়াম না করলেও প্রতিদিন বৈকালিক ফুটবল খেলা থেকে আমাদের রেহাই ছিল না। কারণ তা ছিল পাড়ার সব ছেলেদের জন্য বাধ্যতামূলক। কোন ছেলে আসতে না চাইলে ডংকুদা নিজে তার বাবার সাথে কথা বলে ছেলেকে পাঠাতে বলতেন। হিন্দু ও মুসলমান নির্বিশেষে অভিভাবকরাও সবাই ডংকুদাকে তাঁর এই নিঃস্বার্থ খবরদারির জন্য পছন্দ ও শ্রদ্ধা করতেন।

ডংকুদার এই বাধ্যতামূলক ফুটবল খেলার রেফারি হতেন বশিরদা বা শৈলেসদা। টিম বিভাজনও ছিল মজার। প্রতিদিনই টস্ হতো। নানা বয়সের ছেলেরা অর্থাৎ পিচ্চি থেকে যুবক সবাই একসাথে খেলতো। সবচেয়ে মুশকিল হতো চরম উত্তেজনার সময়ে যখন রেফারিগিরি ছেড়ে বশিরদা শৈলেসদারা নিজেরাই খেলতে নেমে যেতেন। ডংকুদা সবসময়েই থাকতেন মাঠের কিনারে পরামর্শক ও বিচারক হয়ে। প্রায়ই বাছাই করা কিশোরদের নিয়ে ডংকুদার গঠন করা ‘ভুঁইয়ার বাগ ফুটবল টিম’ বিভিন্ন জায়গার খেলতে যেত এবং অন্য টিমরাও আমাদের মাঠে খেলতে আসতো। আমাদের টিমের খেলোয়ার যাদের কথা মনে পড়ে তারা হলো ননীদা, হুমায়ুন, বাদল, সাধন, স্বপন, বড় ফারুক (আমি), ছোট ফারুক, খোকন, খোকন মামা, জুয়েল, লিটন, মজনু, স্বপন, জাপান, ফ্রান্স, এডেন, কোকোদা, অলকদা, রঞ্জিত, রোহিত, বিশ্বনাথ, দিলীপ-১, দিলীপ-২ প্রমুখ। মিন্টুমামা ছিলেন আমাদের দলের পার্মানেন্ট গোল কিপার, কারণ গোল কিপিংয়ে তিনি শুধু আমাদের পাড়াতেই নয়, পুরো দেওভোগ এলাকাতেই ছিলেন বিখ্যাত। ফুটবল আমিও খেলতাম, কিন্তু ডংকুদা-বশিরদার প্রবল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমার দুর্বল স্বাস্থ্যের কোন উন্নতি না হওয়ার কারণে বাইরের টিমের সাথে খেলার সময় আমাকে রাখা হতো না। এতে আমার কোন খেদ ছিল না, বরং খেলতে হচ্ছে না বলে স্বস্তি পেতাম। তো এই বিশাল ফুটবল বাহিনীর নেতা ছিলেন ডংকুদা। কে কেমন খেলে তা তাঁর যেমন জানা ছিল, তেমনি তাদের লেখাপড়ার পাশাপাশি ভদ্রতা ও সৌজন্য শেখা এবং শাসন নিয়েও তাঁর ছিল তৃতীয় নয়ন।

ভুঁইয়া বাড়ির উত্তরের বাগানে আমাদের যাতায়াতে কোন নিষেধ ছিল না। কিন্তু আমের মৌসুমে কারো আম পাড়া নিষেধ ছিল। এখনকার দিনে শুনলে অবাক লাগবে, আমরা সবাই সেই নিষেধ মেনে চলতাম। পাকার পর যেদিন সবগুলো গাছ থেকে আম পাড়া হতো সেদিন আমাদের সবার জন্য হতো উৎসবের দিন। কারণ সেই আমে আমাদেরও ঈর্ষণীয় ‘হক’ ছিল। হৈচৈ করে আম পেড়ে লাইন ধরে আমরা পাড়ার ছেলেমেয়েরা ডংকুদার কাছ থেকে সেই হকের আম গ্রহণ করতাম।

পাড়ার কোন ছেলেমেয়ে পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করলে ডংকুদার কাছ থেকে অবধারিত পুরষ্কার হিসাবে চালতার মোরব্বা পাওয়া যেত। তিনি কিভাবে চালতার মুরব্বার বৈয়ম এভাবে সাজিয়ে রাখতেন পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য ভাবতে অবাক লাগে।

আমাদের পাড়াটি ছিল খুবই শান্তিপূর্ণ। দূর্গা সরস্বতী লক্ষী মনসা কালী দোল পূজাগুলোতে আমরা মুসলমানরা যেমন নিমন্ত্রণ খেতাম তেমনি আমাদের ঈদের দাওয়াতেও হিন্দু বন্ধু ও অভিভাবকরা আসতেন, ডংকুদা সাধনবাবু তারাও, শুধু কোরবানির ঈদের দিন বাদে। আমরাও কোরবানির ঈদের দিনগুলোতে গরুর মাংস বা থালাবাসন দিঘীতে ধুতে আনতাম না। তারাও কখনো দিঘীতে আনতো না কাছিমের মাংস। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল এটিও।

প্রতিবেশীদের মধ্যে বড় ঝগড়া আমরা কখনো দেখিনি। আর ছোটখাটো ঝগড়া বা মনোমালিন্য মীমাংসার জন্য পাড়ার আদালত ছিলেন ডংকুদা। তাঁর বিচার হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবাই একবাক্যে মেনে নিত। বিভিন্ন বয়সের এতগুলো ছেলে আমরা এই পাড়াতে ছিলাম, কিন্তু নিজেদের মধ্যে কখনো মারামারি হয়েছে তা মনে পড়েনা। সেটিও ডংকুদার কারণে।

বাইরে থেকে এসে কোন মাস্তান আমাদের পাড়ার কোন ছেলের গায়ে হাত তুলবে বা পাড়ার কোন মেয়ের বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করবে কিংবা কোন মেয়েকে রাস্তায় উত্যক্ত করবে সেটি অকল্পনীয় ছিল ডংকুদার প্রখর দৃষ্টির কারণে।

ডংকুদার সামাজিক শাসনের আরেকটি উদাহরণ ছিল আমাদের দিঘীর পানি। ডংকুদা পাড়ার সবাইকে নিয়ে নিয়ম করেছিলেন যে এর পানিকে পরিষ্কার রাখার জন্য সবাইকে অবদান রাখার অংশ হিসাবে এখানে গোছল করা যাবে, কিন্তু সাবান দিয়ে নয়। সাবান দিতে হলে বালতিতে পানি নিয়ে মাঠে বসে সাবান মাখতে হবে। একই নিয়ম কাপড় কাচার জন্যও। থালাবাসন ধোয়া যাবে, কিন্তু সাবান দিয়ে নয়। গরুবাছুর গোছল করানোরতো প্রশ্নই আসে না। এর ফলে দিঘীর পানি ছিল টল্টলে পরিষ্কার। আর ছিল প্রচুর ছোটবড় মাছ। পাড়ার বাইরে থেকেও অনেকে অনেক দূর হেঁটে এই তালদিঘীতে গোছল করতে আসতো।

আমার ছেলে ও কিশোরবেলায় এমনটিই ছিল আমাদের এই প্রিয় পাড়া ভুঁইয়ার বাগের সামাজিক ও পরিবেশগত অবস্থা।

স্বাধীনতার পর ডংকুবাবু অসুস্থ হয়ে কোলকাতায় পরিজনের কাছেই থাকছিলেন। তাঁর দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে ডংকুদার এক শরীক পাশের ঘরের গোপাল ডাক্তারের ছেলে শিপিং লাইনে চাকরিরত গণেশদা সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন। বশিরদা কেন জানি আর আসতেন না। শৈলেসদা সম্ভবত ভারতে চলে যান। ভুঁইয়া বাড়ির আশ্রিত বেশ কয়েকঘর গরিব মানুষ ও মিস্ত্রি ছিল, তারাই সম্পত্তি দেখাশোনা করতো। ডংকু বাবুর অনুপস্থিতিতে পাড়ার মধ্যে বাইরের লোকজনের আনাগোনা বেড়ে যায়। রাতের বেলায় কে বা কারা আশ্রিতদের ঘরে ঘরে গিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেওয়া শুরু করে। গরিব মিস্ত্রিরা যাবে কোথায়, তারা মাটি কামড়ে পড়ে থাকে। রাতে কে বা কারা তাদের ঘরের চালে বড় বড় ঢিল ছুঁড়তো। কাজ না হওয়ায় এরপর শুরু হয় বাইরের মানুষদের গভীর রাতে মাতলামি, তাদের ঘরে প্রবেশ করে গভীর রাতে ভীতি প্রদর্শন ও প্রহার, এর পরের পর্যায়ে তাদের মেয়েদেরকে ধর্ষণ। এই গরিব মানুষগুলোর শত কাকুতিমিনতিতেও নিষ্কৃতি মেলেনি। ডংকুবাবুর অনুপস্থিতিতে তারা দিশেহারা হয়ে পাড়ার হিন্দু-মুসলমান অভিভাবকবৃন্দ ও এলাকার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের কাছে বিচার ও আশ্রয় চায়। কিন্তু মিস্ত্রিরা কাউকে চিনতে পারেনি, এরা সবাই বহিরাগত ও অচেনা, এই যুক্তিতে (!) কেউ বিচার করেননি। আব্বা, ওদুদমামা, বাচ্চুমামা, মিন্টুমামাসহ পাড়ার মুসলমান গণ্যমান্যরাও সান্তনা প্রদান আর বিভিন্ন জায়গায় দেনদরবার করা ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি। আমরা ডংকুবাবুর কোন ঠিকানাও জানতাম না। কোলকাতা থেকে কোন খবর এসেছে কিনা জানতে আমরা টানবাজারের শ্রীগুরু বস্ত্রালয়ে খোঁজ নিতাম।

তখন দেখেছি গণেশদা তড়িঘড়ি করে সব বিক্রি করে দিতে শুরু করেন। যেসব জমির মালিক তিনি নন, সেগুলোও তিনি বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কমদামে রীতিমত দলিলে সই করে বিক্রি করতে থাকেন। এমনকি তালদিঘীর পশ্চিম পাড়ের মাঠটি, যা পাকিস্তান আমল থেকে এনিমি প্রপার্টি বলে সবাই জানতো, তাও তিনি বিক্রি করে দেন। অনেক পরে ডংকুদাও একসময় এসেছিলেন অসুস্থ শরীর নিয়ে। আমরা তাঁর গুণমুগ্ধরা দেখা করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের সাথে তেমন কোন কথাই বলেননি। অথচ দীর্ঘদিন পর দেখা হওয়াতে আগের মতো উচ্ছলতা না হোক, অন্তত কিছুটা উষ্ণতা আমরা আশা করেছিলাম। সেদিন তাঁর এই কথা না বলা কি অসুস্থতার কারণে, নাকি কোন এক প্রগাঢ় অভিমানে, সে বিষয়ে আমি আজো নিশ্চিত নই।

ডংকুদার চুপচাপ থাকা পাগলাদা, আমাদের হৃষিকেশদা, কোথায় চাকরি করতেন আমরা তখনো জানতাম না। তিনি বিয়ে করেন এবং এরপরে একেবারেই চলে যান। তাঁর বাড়িটি হয়ে যায় এবানডোনড্। সম্ভবত ভুঁইয়ার বাগের অবস্থা দেখে কাউকে না জানিয়ে তিনি তখনই বাড়ি ছাড়েন, কমদামে ‘বিক্রি’ করতেও তাঁর প্রবৃত্তি হয়নি।

আজ আমরা নাসিরনগর, মাধবপুর, গোবিন্দগঞ্জের ঘটনাগুলো যখন পত্রপত্রিকায় দেখি তখন নীরবে-নিভৃতে ঘটে যাওয়া ভুঁইয়ারবাগের ঘটনাগুলোর কথা মনে পড়ে, আর নিজের কাছেই লজ্জা পাই।

সেই ভুঁইয়ার বাগে এখন প্রচুর মানুষের বাস। আগের মানুষগুলোর অধিকাংশই আজ নেই। জায়গাগুলোর হাতবদল হয়েছে। অনেক পরে আমরাও বাড়ি বিক্রি করে ঢাকায় থিতু হয়েছি।

সাধনবাবু, মণীন্দ্রবাবু, পরেশবাবু, শম্ভুবাবুদের কথা খুব মনে পড়ে। বন্ধু সহপাঠী সহখেলোয়ারদের কথা মনে পড়ে। মন খারাপ হয়। কিন্তু মন ভাল হয় যখন এই বিদ্যানিকেতন স্কুলটাকে দেখি। ডংকুদাদের দেওভোগের নাগবাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সরকারি যক্ষা হাসপাতাল। আর তুমুল বইপড়–য়া ও চুপচাপ সেই হৃষিকেশদার পরিত্যাক্ত বাড়িটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে স্কুল। আজ যা রূপান্তরিত হয়েছে একটি হাই স্কুলে। যেটি প্রতিষ্ঠা করেছে আমাদের মতো ডংকুদার আরেক গুণমুগ্ধ হুমায়ুনের নেতৃত্বে এলাকাবাসী।

মনে পড়ে আমাদের ছেলেবেলার সেই সময়ে একটা প্রাইমারি স্কুল ছিল সেই লক্ষীনারায়ণ আখড়ার পাশে। ছোট একটা জায়গায় অসংখ্য ছাত্রছাত্রী গিজগিজ্ করতো। সবাই বসার জায়গা পেতো না। আমার ছোট ভাইবোনেরা পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত সেখানেই পড়েছে। এরপর কেউ গেছে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল কিংবা মর্গান গার্লস হাই স্কুলে। ভুঁইয়ার বাগ থেকে কচি কচি বাচ্চাগুলো দুর্গম পিচ্ছিল কাঁচা রাস্তা দিয়ে আছাড় খেতে খেতে প্রাইমারি স্কুলে যেত। কিংবা কিশোর-কিশোরীরা অনেক দূরের স্কুলে, গাড়ি বা রিকশায় নয়, বরং ঠা ঠা রোদ বা অঝোর বৃষ্টিতে হেঁটে হেঁটে এক/দেড় মাইল দূরের স্কুলে। চিত্রটি আজকের দিনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটাই ছিল বাস্তব। সেই কাঁচা রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে রাবিশ ছড়ানো থেকে ইট বিছানো, সেখান থেকে এখন পাকা সিমেন্টের রাস্তা হয়েছে। প্রচুর ঘরবাড়ি ওঠেছে মাঠ বাগান আর খালি জায়গাগুলোতে। এতবেশি মানুষ এখন ভুঁইয়ার বাগে বাস করেন যে ঘনবসতি বললেও কম বলা হবে। ভুঁইয়ার বাগ এলাকার আশেপাশের মানুষদের সন্তানদেরও তো একই অবস্থা। কিংবা জিউস দিঘীর পশ্চিম পাড়ের আরেক ঘনবসতির মানুষেরা? কোথায় পড়তে যাবে এই বিপুল সংখ্যার ছেলেমেয়েগুলো?

প্রখ্যাত সাংবাদিক কাশেম হুমায়ুন বা হুমায়ুন আমার সমবয়সী। আমরা একসাথে বড় হয়েছি এই ভুঁইয়ার বাগে। ছেলেবেলা থেকেই মানুষের জন্য কাজ করা ছিল তার পছন্দ। সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত হয়েছিল তার নবীণ তারুণ্যের কালে। সেখানেও গণমানুষের কথা বলাই ছিল মুখ্য উদ্দেশ্য। ‘সংবাদ’ নামের প্রখ্যাত দৈনিকটির সাথে হুমায়ুন জড়িত সম্ভবত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে। একটি পত্রিকার সাথে এতদিন থাকা, ভাবা যায়! কিন্তু আমি যে হুমায়ুনকে জানি সে এমনই। ভাল লাগা তার কাছে একটা খুব বড় বিষয়। মন থেকে যে কাজটি সে পছন্দ করে সেটিতে সে লেগে থাকবে যেভাবেই হোক। এই একনিষ্ঠতা নিয়ে সফল না হওয়া পর্যন্ত সে কাজ করে। মানুষের, বিশেষ করে বাচ্চাদের, সমস্যার কথা বিবেচনা করে হুমায়ুন উদ্যোগ নিল এই ভুঁইয়ার বাগেই তাদের জন্য একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করবে। সবাই সমর্থন করলো। বিশেষভাবে প্রায় সার্বক্ষণিক সহযোগিতা পাওয়া গেল ছোটভাই সালাম এবং সরকারি কর্মকর্তা আখতার হোসেন ,নাজির হোসেন,মনির হোসেন, মোয়াজ্জেম হোসেন সোহেল, দেলোয়ার হোসেন চুন্নুদের কাছ থেকে। হুমায়ুনের সহপাঠী দেলোয়ার হোসেন চুন্নু, দেওভোগের সাবেক জনপ্রিয় কমিশনার, ভুঁইয়ার বাগের বাসিন্দা না হলেও জনহিতকর যেকোন জায়গার যেকোন কাজে হাত লাগাতে যে সদা উদগ্রীব, তার সাহায্যও পাওয়া গেল। আমি দূর থেকে সবার কথা জানিনা। নিশ্চয়ই এরকম একটি কর্মযজ্ঞে এদের মতো আরো অনেকে দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। হুমায়ুনের সাথে মাঝেমধ্যে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় সবার কথা জানার আমার সুযোগ হয়নি। এ আমার সীমাবদ্ধতা। কিন্তু আমি সংশ্লিষ্ট সবাইকে এজন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও অভিনন্দন জানাই। এই মানুষগুলোর প্রতি সতত আমার বিন¤্র শ্রদ্ধা। হুমায়ুনসহ এই মানুষগুলোর স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।

আমরা হয়তো আমাদের দেশ নিয়ে যে স্বপ্ন ছিল তার সব বাস্তবায়ন দেখতে পাইনি। বর্তমান সরকারের আমলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কৃষি-যোগাযোগ-অর্থনীতি ইত্যাদি সবকিছুতে দেশ অনেক এগিয়ে গেছে এবং অগ্রগতির এ ধারা বহমান। কিন্তু এখনো বিশ্ব ব্যাংকের হিসাবে দেশের চার কোটি মানুষ দরিদ্র, আর দুই কোটি মানুষ হত দরিদ্র। এখনো নি¤œবিত্ত মধ্যবিত্তদেরকে জীবনধারনের জন্য প্রাণান্তকর সংগ্রাম করতে হয়। এখনো সাম্প্রদাযিকতার বিষবাষ্পকে আমরা নিঃশেষ করতে পারিনি। এখনো ধর্মীয় চেতনা দিয়ে কেউ কেউ রাজনীতিকে আচ্ছন্ন করতে চায়। এখন মৌলবাদ আমাদের এই বাংলাদেশটাকেই গ্রাস করতে তৎপর। কিন্তু তারপরও আমাদের কোন ছোট ছোট স্বপ্নও যদি বাস্তবায়িত হয় তখন বিপুল আনন্দ হয়। মনে হয় বাঁচার কিছু মানে অবশ্যই আছে। আমরা সবাই যদি মানুষের জন্য উপকারী ছোট ছোট স্বপ্নকেও সত্যি করার জন্য লেগে থাকি, তাহলে চারদিকের এই বিন্দু বিন্দু সাফল্যগুলো সমষ্টিগতভাবে বিরাট হয়ে পুরো দেশটাকেই বদলে দিতে পারে।

হাঁটি হাঁটি পা পা করে এই বিদ্যানিকেতনটি আজ হাই স্কুল হয়েছে। ভুঁইয়ার বাগের ছেলেমেয়েদের আর অন্য কোথাও যেতে হচ্ছে না। এটি একটি বিরাট আনন্দ সংবাদ। হুমায়ুন,নাজির , চুন্নু, আখতার, বাচ্চু মামা,সালাম ,মনির, আহসানউল্লাহ, সোহেল,হোসেন বেপারী ও অন্যরা একসময় পৃথিবীতে থাকবে না, প্রকৃতির নিয়মে তারা সবাই একে একে চলে যাবে। কিন্তু এই স্কুলটি থাকবে। আরো বড় হবে। এর শিক্ষার্থী সংখ্যা আরো বাড়বে। এর সুনাম আরো ছড়িয়ে পড়বে চতুর্দিক। তখন এর প্রতিষ্ঠাতারা বেঁচে না থাকলেও বেঁচে থাকবে তাদের নামগুলো, অনাদিকাল।

হৃষিকেশদা নিশ্চয়ই এখনো বেঁচে আছেন, অন্তত এটা বিশ্বাস করতে দোষ কি। আমি নিশ্চিত, যে নিষ্ঠুর ও অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি ও তার পরিবার অসহায়ের মতো নীরবে মাতৃভূমি ছেড়েছেন, তিনি যদি একবার এসে দেখতেন তাঁর নাড়িপোতা জমিটিতে এমন একটি ভালো কাজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, অত্যন্ত পড়–য়া মানুষটির বাড়িতে নিরন্তর পড়ালেখার ব্যবস্থা করা হয়েছে, তিনি নিশ্চয়ই খুশি হতেন।

বিদ্যানিকেতন হাই স্কুল ও সংশ্লিষ্ট সবার জন্য রইলো আন্তরিক শুভকামনা।
অধ্যাপক আ ব ম ফারুক
সাবেক ডীন, ফার্মেসি অনুষদ; সাবেক চেয়ারম্যান, ফার্মেসি বিভাগ; সাবেক চেয়ারম্যান, ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: abmfaroque@yahoo.com,  ফোন: ০১৮৩ ০০০ ২৮২৬