অচিরেই শুরু হচ্ছে ডিএনডি’র জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পের কাজ

64

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম: ডিএনডি’র জলাবদ্ধতা নিরসনে নেয়া ৫৫৮ কোটি টাকার প্রকল্পের বাস্তবায়নের কাজ অচিরেই শুরু হবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্প বাস্তবায়নকারি প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনী এর মধ্যেই কাজ শুরুর জন্য শিমরাইলে তাদের ক্যাম্প অফিস নির্মাণ শুরু করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের শুরুতে ডিএনডি’র বেদখল হয়ে যাওয়া খাল ও সেচনালা উদ্ধারে ডিএনডি এলাকায় চালানো হবে ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান।
এখন বর্ষাকাল না। সর্বশেষ টিপটিপ বৃষ্টি হয়েছিলো গত ১৬ নভেম্বর। কিন্তু ডিএনডি’র ভেতরের নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ কার্যালয়ের পাশ দিয়ে বুড়ির দোকানের দিকে যাওয়া রাস্তাটিতে এখনো পানি। এলাকার প্রবীন ব্যাক্তি আব্দুল আলি জানালেন, এই রাস্তাটি পুরোই ছিলো ডিএনডি’র খাল। সে খালটি ভরাট করে তৈরী করা হয়েছে রাস্তা। রাস্তা তৈরীর পর খালের পাশে সরু নালা রাখলেও এলাকায় যে পরিমান পানি প্রতিদিন মানুষ ব্যবহার করে তা-ই নিতে পারেনা এই নালা। রাস্তা নির্মাণ করে যেমন খালটি বেদখল হয়েছে, তেমনি অনেক অসংখ্য জায়গায় এ খাল বহুতল ভবন নির্মাণ, দোকান নির্মাণসহ নানাভাবে বেদখল হয়েছে। ফলে এ এলাকার পানি ডিএনডি’র পাম্প হাউজ পর্যন্ত পৌছায় খুব ধীর গতিতে। এ এলাকার আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ আল মামুন জানান, বৃষ্টি হলেই আতঙ্কে থাকি কখন জলাবদ্ধতা প্রকট হয়। পানি বাড়িঘরে যায়।
এই এলাকায় তবু খালের বদলে একটি নালা রয়েছে। কিন্তু ডিএনডি’র আদমজী খালের কোনো অস্তিত্বই এখন নেই। জালকুড়ি- দেলপাড়া-সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার কংশ নদী এক সময় কংশ খাল হয়ে বেঁচে ছিলো। কিন্তু এখন তারও কোনো অস্তিত্ব খুজে পাওয়া মুশকিল। ডিএনডি’র ঢাকা অংশের মাতুয়াইলের মৃধাবাড়ি থেকে শনির আখড়া হয়ে শ্যামপুর ব্রীজ পর্যন্ত খালের ওপর প্রায় ৮ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ডিএনডি’র খনন করা খাল ছিলো প্রায় ১০০ কিলোমিটার। এছাড়া ছিলো প্রাকৃতিক খাল ও নদী। এবং ছোট নিস্কাশন নালা। এগুলির বেশিরভাগই এখন বেদখল হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিভিশন ওয়ান এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও ডিএনডি প্রজেক্টের পিডি আব্দুল আউয়াল মিয়া জানান, ডিএনডি’র জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫৫,৮১৯ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই শুরু হবে। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারি সংস্থা বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। আর বাস্তবায়নকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী এর মধ্যেই সিদ্ধিরগঞ্জে ডিএনডি’র পাম্প হাউজের পাশে ডিএনডি’র পরিত্যাক্ত একটি গ্যারেজে তাদের ক্যাম্প অফিস নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। এই মূহূর্তে সময় নির্দিষ্ট করে বলতে না পারলেও আশা করছি অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই কাজ শুরু হবে। যেহেতু ডিএনডি’র খাল, নালার বেশিরভাগই বেদখলে রয়েছে তাই প্রকল্পের শুরুতেই এগুলি উদ্ধার কাজ শুরু হবে। আমাদের হিসেবে প্রায় ৯৪ কিলোমিটার খাল আমাদের উদ্ধার ও পুনঃখনন করতে হবে। এজন্য ব্যায় ধরা হয়েছে তেরো কোটি চৌদ্দ লাখ টাকা। এ খাল পুনঃ খননের মাধ্যমে যে মাটি উঠবে সেগুলি দিয়ে দু’পার উঁচু করে হাটা পথ তৈরী করা হবে। এছাড়া ডিএনডি’র ৩২,৫০০ ঘনমিটার সংযোগ খালও পুনঃখনন করা হবে। এজন্য ব্যায় ধরা হয়েছে তিন কোটি পঁচিশ লাখ টাকা। নতুন প্রকল্পের জন্য ১০ হেক্টর জমি অধিগ্রহন করা হবে। ৭৯ টি কালভার্ট নির্মাণ করা হবে। দুইটি ক্রস ড্রেন, ১২ টি আরসিসি গার্ডার ব্রীজ, বর্তমানে থাকা ৫২টি ব্রীজ ও কালভার্ট পুননির্মাণ করা হবে।
রোববার দুপুরে ডিএনডি’র পাম্প হাউজের পাশে ডিএনডি’র গ্যারেজে গিয়ে দেখা যায় সেখানে সেনাবাহিনীর একটি দল কাজ করছেন। তারা নতুন ছাউনি নির্মাণ, পরিত্যাক্ত গ্যরেজটি পরিস্কার করে অবস্থানের উপযোগি করছিলেন। এখানে কথা হয় সেনাবাহিনীর সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার ওহায়েদ আলির সাথে। তিনি জানান, প্রায় এগারোদিন ধরে তারা এখানে ক্যাম্প নির্মাণের কাজ করছেন। প্রকল্পের কাজ কবে শুরু হবে ? এ প্রশ্নের উত্তরে জানান, এ বিষয়টি এ প্রকল্পের দায়িত্বে যে সেনা কর্মকর্তা রয়েছেন তিনি বলতে পারবেন।
‘ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার নিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন (২য় পর্যায়) শীর্ষক প্রকল্পের বাস্তবায়নকারি প্রতিষ্ঠান এর পক্ষে প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রোমিও নওরিন খান জানান, পুরোদমে কবে কাজ শুরু হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছেনা। তবে ঐ এলাকার আমাদের ক্যম্প বানানো শুরু হয়েছে। কাজ শুরু হলে পুরো বিষয়টি জানানো হবে।
১৯৬২ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত তৈরী হয় ডিএনডি বাঁধ। ১৯৬৪ সালে ৮হাজার ৩৪০ হেক্টর জমির চারিদিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা বাধ দেয়া হয়। উন্নজাতের ফসল চাষ করে তা সাড়াদেশে ছড়িয়ে দিতে প্রদর্শনী খামার হিসেবে ব্যবহার করা হতো ডিএনডি’র জমি। ডিএনডি এলাকার সেচ খালগুলিতে শীতলক্ষা নদী থেকে পানি এনে সেচ দেয়ার জন্য রয়েছে প্রায় একশ কিলোমিটার ছোট বড় খাল। তবে ১৯৮৮’র বন্যার পর থেকে পাম্প হাউজ সেচের বদলে ডিএনডি এলাকার পানি নিস্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। ডিএনডি’র ভেতরে এখন এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে যে, বৃষ্টিপাত না হলেও এখানে শুধু মানুষের ব্যবহৃত পানি-ই প্রতি সেকেন্ডে দুই হাজার কিউসেক নিস্কাশন করা প্রয়োজন বলে জানালেন ডিএনডি’র পাম্প হাউজের দায়িত্বে থাকা পাউবো’র সাব ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জাব্বার। তিনি জানান, প্রায় তেপ্পান্ন বছর আগে বসানো ডিএনডি’র পাম্প হাউজের চারটি পাম্পের মোট নিস্কাশন ক্ষমতা অফিসিয়ালি প্রতি সেকেন্ডে ৫১২ কিউসেক। কিন্তু বেশ পুরনো হওয়ায় পাম্পগুলির ক্ষমতা কমে গেছে। বাস্তবে এগুলি হয়তো প্রতি সেকেন্ডে আড়াইশ থেকে তিনশ কিউসেক পানি নিস্কাশন করতে পারে। নতুন প্রকল্পে শিমরাইল ও আদমজী নগরে দুইটি পাম্প ষ্টেশন নির্মাণ করা হবে। শিমরাইলে নির্মাণ করা নতুন পাম্প ষ্টেশনে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২০০ কিউসেক পানি নিস্কাশনের ক্ষমতা সম্পন্ন সাতটি পাম্প থাকবে। ফলে শিমরাইলের নতুন পাম্প হাউজের ক্ষমতা হবে প্রায় ১৪০০ কিউসেক। আদমজীতে বসানো হবে আরেকটি পাম্প হাউজ যেখানে ২০০ কিউসেক ক্ষমতার ছয়টি পাম্প থাকবে।
ফতুল্লা, পাগলা ও শ্যামপুরে বসানো হবে তিনটি পাম্পিং প্ল্যান্ট। ফতুল্লায় দশমিক আটাশ কিউমেক ক্ষমতার ১২ টি, পাগলায় একই ক্ষমতার দশটি এবং শ্যামপুরে দশমিক চৌদ্দ কিউমেক ক্ষমতার দুইটি নিস্কাশন পাম্প বসানো হবে। #