ন্যায্য মুজুরি না হলে,বিশ্বখ্যাত মসলিন শিল্পের মত হারিয়ে যাবে জামদানি শিল্প

563

হানিফ মোল্লা-রূপগঞ্জ প্রতিনিধি: রাজধানী ঢাকা থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটারের পথ রূপগঞ্জ। রাজধানীর নিকটবর্তী হওয়ায় রূপগঞ্জে এখন শহরের আনাগোনা। জামদানী শিল্পের ঐতিহ্য মন্ডিত নোয়াপাড়া এলাকা। সুলতানা কামাল সেতু ও ডেমরাঘাট পেরিয়ে শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষা রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলেই চোখে পড়বে জামদানী শিল্পের সমাহার। নোয়াপাড়ার প্রায় প্রতিটি পরিবারই কোন না কোনভাবে জামদানী শিল্পের সাথে জড়িত। কেউ সরাসরি শাড়ী উৎপাদন করছে, কেউ তাঁতী, কেউবা সুতা ও রং বিক্রেতা। আবার কেউ জামদানী শাড়ী দেশের বাইরে রপ্তানীর সাথে জড়িত। প্রতিটা পরিবারেই ২-৪টা করে তাঁত রয়েছে। বলা চলে এটা তাদের বাপ দাদার পেশা। এদের বংশধররা এক সময় বিশ্বজোড়া মসলিন কাপড় তৈরি করতো। জামদানি শাড়ীর নকশা বুনন প্রদ্ধতি ও অভিন্ন শাড়ীর নামকরণ হয়ে থাকে। করোলা, ময়ুর প্যাচপাড়, চন্দ্রপাড়, দুবলা জাল, সাবু দানা ইত্যাদি জামদানীর জমিনে ফুটে উঠে। জামদানী শ্রমিকদের ন্যায্য মুজুরি না হলে,বিশ্বখ্যাত মসলিন শিল্পের মত হারিয়ে যাবে জামদানি শিল্প। এমনটাই জানিয়েছেন, জামদানী শ্রমিকরা।

ঢাকার ডেমরায় বাওয়ানী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে যুগ যুগ বছর ধরে জামদানী শাড়ির হাট বসছে। ডেমরায় জামদানী তৈরি না হলেও বিক্রির জন্য একমাত্র হাট বাওয়ানী স্কুল মাঠ। এখানে প্রতি শুক্রবার রাত ১১ টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত চলে বেচাকেনা। এ হাটে রূপগঞ্জের নোয়াপাড়াসহ আশপাশের ১৪টি গ্রামের তাঁতীরা তৈরি শাড়ি নিয়ে আসতে হতো। এখানে আসতে শীতলক্ষ্যা নদী পাড়ি অথবা ডেমরা সুলতানা কামাল সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যবসায়ী ও জামদানী শিল্পীরা ছিনতাইকারীদের কবলে পড়তে হতো। ফলে বর্তমান সরকার তাঁতীদের দুর্ভোগ লাগবে এ হাটটি নোয়াপাড়া জামদানী পল¬ীতে স্থান্তান্তর করেন।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রূপগঞ্জে তিন হাজারের অধিক জামদানী শিল্পী পরিবার রয়েছে। মূলত: রূপগঞ্জের নোয়াপাড়া, রূপসী ¯¬ুইচ গেইট, গঙ্গানগর, বরাবো, পবনকূল, মৈকুলী, খাদুন ও পার্শ্ববর্তী সোনারগাঁও এবং সিদ্দিরগঞ্জের কয়েকটি এলাকায় জামদানী কারু শিল্পের সমাহার। বিসিকের হিসেব অনুযায়ী প্রায় তিন হাজার পরিবারের ১৫ থেকে ১৬ হাজার লোক জামদানী শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে তাদের হিসেবে জামদানী তাঁেতর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার। বিগত সময়ে নানা সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অসংখ্য জামদানী তাঁত। শিল্পনগরীর বাইরে কয়েক হাজার জামদানী তাঁত শিল্পী যে পরিবেশে বসবাস করে তা দেখলে মনেই হবে না যে তারা এত উন্নত মানের শাড়ী তৈরি করছে। অথচ এমন পরিবেশে এত সুন্দর হৃদয় কাড়া রমনী মোহন শাড়ী তৈরি করে কিভাবে? এ প্রশ্ন জাগবে সবার মনে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যের ধারক এই শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে দক্ষিণ রূপসী গ্রামে ১৯৯২ সালে জামদানি পল¬ী প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয় সরকার। জামদানি শিল্প ও তাঁতীদের ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করাই ছিল এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা (বিসিক)কে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরে বিসিক একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করে। ওই জরিপ রির্পোটে তারাবো পৌরসভার নোয়াপাড়া ও দক্ষিণ রূপসীসহ ১৪টি গ্রাম এবং সিদ্ধিরগঞ্জের একটি গ্রামকে জামদানি এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছরে জমি অধিগ্রহণের জন্য ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দ এবং ১৯৯৫ সালের ২৭ এপ্রিল ২০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৬ সালের ৮ এপ্রিল অধিগ্রহণকৃত জমিতে মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়।
১৯৯৮ সালে ২৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় প্রশাসনিক ভবন। বিপনন কেন্দ্র, হাট কর্ণারের তিনটি শেড, পাম্প হাউস, অভ্যন্তীণ সড়ক নির্মাণ, ড্রেন ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পন্ন করা হয়। এ পল¬ীতে প¬ট পেয়েছে ৪২০জন তাঁতী। প্রত্যেক তাঁতী ১ হাজার ৫শ’ বর্গফুটের প¬ট বরাদ্দ পেয়েছে ৫৮ হাজার টাকা এককালীন। আর ১০ বছরের জন্য ৭৫ হাজার টাকা।
জামদানী পল¬ী এলাকা জুড়েই রয়েছে এক চালা, দু’চালা খুপড়ি ঘর। অধিকাংশ ঘরই বেড়ার তৈরি। একেকটি ঘরে ৮ থেকে ১০জন লোকের বাসস্থান। মাথার উপরও বাঁশের বেড়া রয়েছে। জামদানী তাঁত বলতে বুঝায় দুই-একটি কাঠের টুকরো, বাঁশ আর একটি বিশেষ ধরণের সানা। দেখলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে এগুলো দিয়ে আবার এত সুন্দর কাপড় হয় কিভাবে? হ্যাঁ, এসব কমদামী কাঠ আর বাঁশ দিয়ে শিল্পীদের হাতের ছোয়ায় তৈরি হয় একটি মনকাড়া জামদানী শাড়ী। শিল্পীরা জামদানীর ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলে বিভিন্ন প্রকারের ফুল, পাখি, মশুর ও দেশের মানচিত্রসহ নানা নকশা। এসব ডিজাইনের পাশাপাশি কম্পিউটারের ডিজাইনও তোলা হচ্ছে জামদানীর বুকে। ভারতীয় তাঁত শিল্পীরা বহুবার চেষ্টা করেও এ শিল্পকর্ম রপ্ত করতে পারেনি। এদেশেও তাঁত শিল্পের প্রসার ঘটেনি। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার নোয়াপাড়া হচ্ছে এ শিল্পের প্রধান কেন্দ্র। তাইতো এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল জামদানী মাঠ। পরে জামদানী মাঠকে জামদানী পল¬ীতে রূপান্তর করা হয়। এখন বিসিক শিল্প নগরীতে পরিণত হয়েছে।
জামদানীর দাম ঃ গুণগতমান আর নকশা কারুকাজের ওপর নির্ভর করে জামদানী শাড়ীর দাম। ১ সপ্তাহ ধরে তৈরি করা হলে সেটার দাম পড়ে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। ২ সপ্তাহে তৈরি করলে শাড়ীর দাম বেশী হয়। একটি সাধারণ শাড়ী তৈরি করতে খরচ ১ থেকে ২ হাজার টাকা। শিল্পীর পারিশ্রমিক নির্ভর করে সময় ও শিল্পীর কাজের ওপর। জামদানী তৈরিতে প্রথমে সিলকের সুতার ভিম ক্রয় করতে ১ হাজার টাকার মতো লাগে। একটি ভিম থেকে ৪টি শাড়ী তৈরি হয়। এখানকার তাঁতীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে শাড়ী ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকায় তৈরি করছে তা বিক্রি করছে আড়াই হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়।
জামদানী বিদেশে রপ্তানি ঃ জামদানি শাড়ি বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল চাহিদা রয়েছে। জামদানি শাড়ির পাইকারি ও খুচরা বেচাকেনার একমাত্র হাট বসে ডেমরার শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম পাড়ে। প্রতি শুক্রবার গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত প্রস্তুতকারি মহাজন, ফড়িয়া ও দেশী-বিদেশী ক্রেতাদের মিলন মেলা বসে এ হাটে। ইদানিং নোয়াপাড়া জামদানী পল¬ীতেও প্রতিদিন জামদানী কেনাবেচা হচ্ছে।
এদিকে রূপগঞ্জের জামদানি পল¬ীর তাঁতীরা সরাসরি হাটে এনে তাদের উৎপাদিত শাড়ি বিক্রি করতে পারছেন না। এক শ্রেণীর দালাল চক্র গড়ে উঠেছে যারা তাঁতীদের কাছ থেকে কম মূল্যে শাড়ি ক্রয় করে হাটে অথবা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শপিংমলগুলোতে সরবরাহ করে অধিক মুনাফা লুটে নিচ্ছে।
কারিগরদের অভিযোগ, দালালরা তাদের জিম্মি করে রেখেছে। এক শ্রেণীর মহাজনরা অগ্রিম দাদন দিয়ে শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছে। তারা জানান, দশ হাজার টাকা মুল্যের একটি জামদানি শাড়ি বুঁনে তারা তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা মজুরি পান। আর এ শাড়িটি বুঁনতে আট-দশ দিন ব্যয় হয়। মুল কারিগর এর সঙ্গে একজন সহকারি কাজ করে। তাকে আটশ’ থেকে এক হাজার টাকা দিতে হয়। ফলে মুল কারিগর দুই হাজার টাকার বেশি মজুরি পাননা। তারা জানান, বংশ পরম্পরায় এ শিল্পের কারিগর তৈরি হচ্ছে।
জামদানি ব্যবসায়ী ইকবাল হোসেন জানান, জামদানি কারিগরদের অভিযোগ অনেকটা সত্য। তিনি বলেন, আমরা প্রকৃত তাঁতীদের কাছ থেকে শাড়ি ক্রয় করতে পাড়ি না। রূপগঞ্জে তাঁতীদের কাছ থেকে দালাল কিংবা মহাজনরা যে শাড়িটি দশ হাজার টাকায় কিনে নিয়ে আসে তা তিন-চার হাত ঘুরে একটি শপিংমলে আসার পর পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু তাঁতীরা এ অতিরিক্ত মুনাফার কোনো সুফলই পাচ্ছেন না। তিনি আরো জানান, দেশের বাইরেও জামদানি রফতানি হচ্ছে। ভারত থেকে সরাসরি ক্রেতারা ডেমরার জামদানি হাটে এসে শাড়ি ক্রয় করে থাকে।
জামদানীর কারিগররা মনে করেন এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে জামদানি তৈরির পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে কারিগররা। হারিয়ে যাবে জামদানি শিল্প। এক সময় নোয়াপাড়ার মসলিন শিল্প ছিল জগদ্বিখ্যাত। এখন এখানকার জামদানির সুনামও বিশ্বজোড়া।