লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিল নতুন মালিকানায় হস্তান্তর ॥ সাত’শ কোটি টাকার সম্পত্তি পয়ত্রিশ কোটি টাকায় বিক্রি

1340

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম, 23 February 2014 at 06:34 pm :

wwwwwwwwwwwএকটি রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে মিলের স্থাবর ও অস্থাবর সকল ধরনের সম্পদ স্থানান্তর বা হস্তান্তরে হাইকোর্ট নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও তা খারিজ  করেই নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলে অবস্থিত নিউ লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলের  দখলদারিত্ব বুঝে নিলেন নিট কনসার্নের মালিক জয়নাল আবেদিন মোল্লা। মিলটিতে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছ থেকে শেয়ার ক্রয় করে নিয়েছেন মিলের বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ। ৭ শ’ কোটি টাকা মূল্যের মিলটি মাত্র ৩৫ কোটি টাকায় একটি শিল্প প্রতিষ্ঠানের  কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগে রয়েছে।দেশের প্রাচীনতম এ মিলটি বন্ধ হওয়ার পর ২০০১ সালে  সরকার শ্রমিকদের মাধ্যমে পরিচালনা করার জন্য একটি পরিচালনা পরিষদের কাছে মিলটি বুঝিয়ে দিলেও নতুন পরিচালনা পর্ষদে নেই শ্রমিকদের কোন প্রতিনিধি।তবে নারায়নগঞ্জ -৫ আসনের সংসদ সদস্য নাসিম ওসমান জানান, নতুন ভাবে মিলটি  পরিচালনার জন্য জয়নাল আবেদিন মোল্লার কাছে মিলটি হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি জানান, এর ফলে বন্ধ মিলটি চালু হলে এখানে সাত হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে।সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বলেন দু’  একটি পত্রিকায় লেখা হচ্ছে এ মিলটির দখল নিয়ে লেখাণেখি হচ্ছে। তিনি জানান, এ মিলটি আধুনিকায়ন হলে ৫ থেকে ১০হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। তিনি জানান, সাসদ নাসিম ওসমানের অনুরোধ্ইে জয়নাল আবেদিন মোল্লা এ মিলটির দায়িত্ব নিয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত নিউ লক্ষ্মী নারায়ণ কটন মিলস এর আন্দোলনরত কয়েকজন শেয়ারহোল্ডার অভিযোগে করেন, সরকার শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য ২০০১ সালের ২১ মার্চ ৫১০ জন শেয়ার হোল্ডারদের নিকট প্রতিটি শেয়ার একহাজার টাকা  মূল্যে মিলটি হস্তান্তর করে। এরা সবাই ছিলেন এ মিলের শ্রমিক।তবে শ্রমিকদের ভাগ্য ১৩ বছরেও উন্নয়ন হয়নি। বরং সাবেক পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্বে মিলে  লুটপাটের মহোৎসব হয়েছে। মিলের ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার মূল্যবান যন্ত্রাংশ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণবাবদ ১২ কোটি ১২ লাখ টাকা শ্রমিকদের পরিশোধ করার কথা ছিল। যার মধ্যে শ্রমিকরা মাত্র ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধ করেছিল। শ্রমিকদের গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিলের কোটি টাকাও আত্মসাৎ করার অভিযোগ রয়েছে সাবেক পরিচালনা পরিষদের বিরুদ্ধে।
তারা জানান, পরিচালনা পর্ষদ তাদের দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ৫১০ জন শেয়ারহোল্ডারকে ডেকে একজন যৌথ বিনিয়োগকারীর কথা বলে তাদের সম্মতি নেয়। সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ধারনা ছিল যৌথ বিনিয়োগ হলে মিলটি পুনরায় চালু হবে এবং তারা পরিবার পরিজন নিয়ে ঠিকমতো চলতে পারবেন। সাধারণ শেয়ার হোল্ডাররা বলেন, এরপর তাদের কাছ থেকে ২ লাখ ৫ হাজার টাকায় শেয়ার ক্রয় করে রেখে দেয়া হয় এবং তার বদলে কাগজপত্রে ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা উল্লেখ করে স্বাক্ষর নেয়। অনেককে শেয়ার বিক্রি করতে চাপ সৃষ্টি করা হতে থাকে। দুর্নীতিবাজ পর্ষদ মিলটির ৪৬৮ টি শেয়ার রফতানীমুখী গার্মেন্ট নিট কনসার্ন লিমিটেডের মালিক জয়নাল আবেদীন মোল্লা ও তার বাইদের কাছে শেয়ার বিক্রি করে দেন। এরপর অর্ধশত শেয়ারহোল্ডার মিলটি রক্ষায় আন্দোলনে নামেন।
২০১৩ সালের ২০ এপ্রিল মিলের পরিচালনা পর্ষদের এমডি পদে নিট কনসার্ন গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন মোল্লা, ভাইস চেয়ারম্যান পদে জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা ও পরিচালক পদে মনির হোসেন মনাকে নিয়োগ দেয়া হয়। বহিরাগতদের মিলের পরিচালনা পর্ষদে স্থান দেওয়ার প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন আন্দোলন শেয়ারহোল্ডাররা। এরপর ২৪ জুন মিলের শেয়ারহোল্ডার নিধু কমল দে গং এর এক রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে মিলের স্থাবর ও অস্থাবর সকল ধরনের সম্পদ স্থানান্তর বা হস্তান্তরে ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করে আদালত। একই সঙ্গে নবগঠিত পরিচালনা পর্ষদ কেন বে-আইনী হবে না তা জানতে চেয়ে রুল নিশি জারি করে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। ৩১ আগষ্ট আন্দোলনরতদের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এরপর থেকে মিলের ভেতরে বহিরাগতদের নেতৃত্বে চলতে থাকে দফায় দফায় হামলা। ২০১৩ সালে মিলটি ৫১০ জন শেয়ারহোল্ডারদের নামে দলিল সম্পাদিত হয়। এদিকে ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারী শেয়ারহোল্ডার মোঃ দেলোয়ার হোসেন গং হাইকোর্টে এক রিট পিটিশন দাখিল করেছেন যাতে আদালত আবারও ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
এদিকে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞার পরেও মিলটির স্থাপনা ভাঙ্গার পাশাপাশি নতুন পরিচালনা পর্ষদও গঠন করা হয়েছে। সরকার শ্রমিকদের নিকট মিলটির দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার সময় থেকে পরিচালনা পরিষদে যারা ছিলেন তারা কেউ নেই নতুন পরিচালনা পরিষদে । নতুন কমিটিতে  সকলেই নিট কনসার্ন গ্রুপের। চেয়ারম্যান পদে নিট কনসার্ন গ্রুপের পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে তার বড় ভাই জয়নাল আবেদীন মোল্লা, ভাইস চেয়ারম্যান পদে অপর ভাই মনির হোসেন মোল্লা। এছাড়া ৪ জন পরিচালক পদে তাদের স্বজন ও অনুগতরা স্থান পেয়েছেন। ২৩ ফেব্রুয়ারী তারা পুরাতন কমিটির নিকট থেকে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন এমপি নাসিম ওসমান। এছাড়া বিশেষ অতিথি করা হয়েছে এমপি শামীম ওসমান।
শেয়ারহোল্ডার স্বার্থরক্ষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক মোঃ হোসেন  জানান, নতুন পরিচালনা পর্ষদ ৭০০ কোটি টাকার মিলটি ৩৫ কোটি টাকায় ক্রয় করে আন্দোলনরত শেয়ারহোল্ডারদের উচ্ছেদে নানা ভাবে চেষ্টা করছে। তাদের হুমকী ধমকী অস্ত্র প্রদর্শন অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাও মানছে না তারা।
মিলের সাবেক চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন প্রধান জানান, রোববার নতুন পরিচালনা পর্ষদ দায়িত্ব নিয়েছে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা কিভাবে শ্রমিকদের দ্বারা পরিচালিত মিলের পরিচালনা পর্ষদে আসীন হলেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান তারা ৪৬৮ টি শেয়ার ক্রয় করে তারা মিলটির মালিক হয়েছেন। এছাড়া বকেয়া ১২ কোটি ১২ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন।তিনি জানান, ১হাজার টাকার শেয়ার তারা ২লাখ ৫ হাজার টাকায় ক্রয় করেছেন।
এদিকে মিলটির নতুন পরিচালনা পরিষদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়নাল আবেদিন মোল্লা জানিয়েছেন, তিনি পুরাতন মিলটিকে সংস্কার করে আধুনিকায়ন করবেন। সেকানে ৭/৮ হাজার লোকের কর্মসংস্থান করতে পারবে।
উল্লেখ্য ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মিলটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। মিলের মোট জমির পরিমাণ ১৮ দশমিক ৬৭ একর। যার বর্তমান বাজারদর প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বলে দাবি শেয়ারহোল্ডারদের। ###