বিত্তবানদের উৎসবের জন্য বন্ধ ছিল দরিদ্রদের দুই শতাধিক দোকান

622

নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকম: নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের বিত্তবানদের ইংরেজী বর্ষবরণ উৎসব উদযাপনের নিরাপত্তার জন্য ক্লাব সংলগ্ন দ্বিগুবাবুর বাজারের দুই শতাধিক দোকানির সব দোকানপাট বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা থেকে বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। ফলে একদিকে দোকানি ও পাইকাররা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। অন্যদিকে কেনাকাটা থেকে বঞ্চিত হয়েছে শহরবাসি। দ্বিগুবাবুর বাজার নারায়ণগঞ্জের একমাত্র পাইকারি বাজার। এ বাজার থেকে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন বাজারে সবজি সরবরাহ হয়ে থাকে।
বৃহস্পতিবার রাত আটটা। নগরীর দ্বিগুবাবুর বাজারের নারায়ণগঞ্জ ক্লাব প্রান্তে দাড়িয়ে ছিলো কিশোর ব্যবসায়ী ইরান। সে জানালো, সে বেগুন বিক্রি করছিলো। সন্ধা পৌনে ছয়টার দিকে পুলিশ এসে পাচ মিনিটের মধ্যে তার দোকান বন্ধ করে ফেলতে বলে। তার পুরো বেগুন বিক্রি শেষ হওয়ার আগেই পুলিশ তার দোকান বন্ধ করে দেয়।
এ প্রান্তে ধনেপাতা বিক্রি করছিলেন মনির মিয়া। তিনি বলেন, আমি বিকেলে দোকান লাগিয়েছি। ফুটপাথের ভাড়া দিয়েছি একশ টাকা। ঝাড়–দারকে দিয়েছি বিশটাকা। লাইটের জন্য দিয়েছি ত্রিশ টাকা। পাচশ টাকার হজপাতা কিনেছিলাম। তিনশটাকা লাভ হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু সব মিলিয়ে মাত্র তিনশ টাকা বিক্রির পর পুলিশ দোকান বন্ধ করে দিয়েছে। কাল শুক্রবার সকাল পর্যন্ত তো আর এ হজপাতা থাকবেনা। শুকিয়ে যাবে। সকালে তাজা হজপাতা আসবে। কেউ শুকনো পাতা নেবে না। ফলে আমার কমপক্ষে দুইশ টাকা ক্ষতি হবে।
দ্বিগুবাবুর বাজার নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে বড় ও একমাত্র পাইকারি সব্জির বাজার। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন মীর জুমলা রোড ও ইন্সটিটিউট রোডে দু’শতাধিক দোকানি বসেন। যারা এখানে সকাল নয়টা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত খুচরা বিক্রি করেন। বাকিটা সময় পাইকারি বিক্রি করেন। তাদের সবাইকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রাত আটটা থেকে এখানে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাইকারি সব্জি আসতে শুরু করে। মুন্সিগঞ্জের রিকাবি বাজার থেকে বারোশত ফুলকপি নিয়ে এসেছিলেন কৃষক মিঠু। তিনি বললেন, ভাই আমার ও আশেপাশের কৃষকদের কাছ থেকে ফুলকপি কিনে বিক্রি করতে এসেছি। পচিশ টাকা পিস কিনে এনেছি। ভেবেছি ফুলকপি পাইকারি বিক্রি করে দিয়ে তাড়াতাড়ি চলে যাবো। কাল ১ লা জানুয়ারি। মেয়ে স্কুল থেকে বই নিয়ে আসবে। মেয়েকে একটা ব্যাগ কিনে দেবো। কিন্তু পচিশ টাকা করে কেনা ফুলকপি পাইকারি কেনার লোক খুব কম। পুলিশ সব দোকানদারকে উঠিয়ে দিয়েছে। যে দু’একজন আছে তারা পনের-বিশ টাকা করে বলছে। বছরের প্রথম দিন মেয়েটাকে ব্যাগ কিনে দিতে পারবো না আরকি।
শুধু বিক্রেতারা না । ক্রেতারাও হঠাৎ এই উচ্ছেদ অভিযানের কারনে চরম বিপদে পড়েন। গার্মেন্ট কর্মী মারজানা আক্তার জানান, বাসায় কোন সব্জি নেই। বৃহস্পতিবার সপ্তাহের পারিশ্রমিক পেয়ে বাজার করতে এসেছি। কিন্তু পুলিশ বাজার বন্ধ করে দেয়ায় এখান থেকে কিনতে পারছি না। বাজারের ফকির টোলা অংশে সব্জি বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু দাম অনেক বেশি।
ব্যাংক কর্মকর্তা আনোয়ার সাঈদ বলেন, কাজকর্ম শেষে আমি প্রায়ই রাতে বাজার করে বাসায় ফিরি। দ্বিগুবাবুর বাজার বেশ রাত পর্যন্ত খোলা থাকে। কিন্তু আজ বন্ধ থাকায় কিছুই কিনতে পারলাম না।
রাত তিনটায় পুলিশ চলে গেলে দ্বিগুবাবুর বাজারে বেচাকেনা শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার রাত দুইটা পর্যন্ত ইংরেজী বর্ষবরন উপলক্ষে ভারতীয় শিল্পিরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ক্লাবের প্রায় আটশ সদস্য, অতিথি ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এ অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। অনুষ্ঠানে নারায়ণগঞ্জে নারী সংসদ সদস্য হোসনে আরা বাবলী, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্তাব্যাক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সভাপতি মাহমুদ হোসেন এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের অনুমোদন নিয়েই এ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। নিরপাত্তার জন্য তারা কি করেছে এটা তাদের ব্যাপার।
নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল মালেক জানান, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে ভারতীয় শিল্পি কুমার শানু, অনুরাধা ও বিপ্লব গান পরিবেশন করেন। তাদের নিরাপত্তার কারনে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সংলগ্ন দ্বিগুবাবুর বাজারের দোকানদারদের বসতে দেয়া হয়নি। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব ও সংলগ্ন এলাকায় প্রায় সত্তুর জন পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।
এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারন সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, কেউ উৎসব করবে আর এজন্য শত শত দরিদ্র মানুষের দোকানদারি বন্ধ থাকবে এটা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য না। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের কর্মকর্তাদের প্রভাবেই প্রশাসন এ ব্যাবস্থা করেছে। এসব দোকানদার দোকানদারি করে মাত্র তিনশ থেকে পাচশ টাকা আয় করতো। তাদের এ আয় বন্ধ করে দিয়ে প্রশাসন নির্মম আচরন করেছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির কারনে অনেক জায়গায় ইংরেজী বর্ষবরনের অনুষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ ক্লাবে বন্ধ করলে কি হতো ? নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সবসময় জনবিচ্ছিন্ন আচরন করে। রমনা বটমূলে হামলার পরে সাড়াদেশের পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান যখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো সেদিনও নারায়ণগঞ্জ ক্লাব অনুষ্ঠান চালিয়ে গেছে। তাদের পাচিলের ভেতরেই তাদের নিরাপত্তা দেয়া যেতো। এজন্য দোকান উচ্ছেদের প্রয়োজন ছিলোনা। আামি তাদের এ ধরনের আচরনের প্রতিবাদ জানাই।#