প্রধান শিক্ষককে কানে ধরে ওঠবস করার ঘটনা তদন্তে, কমিটি গঠন (ভিডিও সহ)

1307

Snapshot - 4নারায়ণগঞ্জ টুয়েন্টিফোর ডটকমঃ নারায়ণগঞ্জে বন্দরে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে স্কুলের প্রধান শিক্ষককে গনপিটুনি ও পরে এমপি’র সামনে কানে ধরে ওঠবস করার ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিলুপ্ত করা হয়েছে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি। স্কুলের পাশের মসজিদের ইমাম ও স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক জানিয়েছেন গনপিটুনির ঘটনার আগে তারা জানতেন না এখানে ধর্মীয় অবমাননার কোন ঘটনা ঘটেছে। এদিকে আহত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত জানিয়েছেন, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সাথে বিরোধের জের ধরে কমিটি পরিকল্পিতভাবে গুজব ছড়িয়ে তাকে হত্যার চেষ্টা করে। ঘটনার ব্যাপারে মামলা করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমি নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছি। তাই মামলা করার বিষয় ভাবতে পারছিনা। তিনি ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তি দাবী করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে শীতলক্ষা নদী পার হয়ে বন্দর উপজেলা। বন্দর উপজেলার দক্ষিনের শেষ প্রান্ত কলাগাছিয়া ইউনিয়নের কল্যানদি গ্রাম। গত শুক্রবার ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহকে নিয়ে কটুক্তি করেছেন – এমন গুজবে উত্তেজিত এলাকাবাসি গনপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করেন এলাকার পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে। পরে স্থানীয় এমপি সেলিম ওসমান একই অভিযোগে তাকে কানে ধরে ওঠ বস করিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। তাকে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে এ ঘটনা ঘটলেও গনপিটুনির ঘটনার আগে ঘটনা জানতেন না পার্শ্ববর্তী কল্যানদি বায়তুল আতিক জামে মসজিদের ইমাম মাহমুদুল হাসান। তিনি জানান, সকাল দশটার দিকে স্কুলের কয়েকজন ছাত্র এসে তার কাছে মসজিদের চাবি চায়। তিনি তাদের জানান, শুক্রবার মসজিদ খোলাই থাকে। চাবির প্রয়োজন নেই। এরপর ছাত্ররা গিয়ে মসজিদের মাইকে ঘোষনা দেয়, ‘আল্লাহ , আল্লাহর রাসুল নিয়ে প্রধান শিক্ষক কটুক্তি করেছেন। স্কুলের উপর হামলা চলছে । আপনারা তাড়াতাড়ি সমাধান দেন। মাতব্বর সাহেবরা কে কোথায় আছেন। তাড়াতাড়ি আসুন। হেডমাস্টার কটুক্তি করার কারনে ছাত্ররা উত্তেজিত হয়েছে। স্কুল রক্ষা করুন। ’ মাইকে কয়েকজন ছাত্রের কন্ঠ আমি শুনেছি। এসময় আমরা জানতে পারি তিনি ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করেছেন। এলাকার অনেকেই তা শুনেছে।
কথা হলো স্কুলের ইসলাম ধর্মের শিক্ষক সৈয়দ বোরহানুল ইসলামের সাথে। তিনি জানান, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অবমাননার কোন অভিযোগ তিনি আগে শোনেননি। ঘটনার পরে স্যার রিফাতের বাসায় গিয়ে তার মার কাছে তাকে পেটানোর জন্য দুঃখ প্রকাশ করে। আমিও তখন যাই। কিন্তু তার মা তখন আমাদের কাছে তিনি এমন কোন অভিযোগ করেননি। এমন কোন রেকর্ড তার নেই। একই কথা জানালেন স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র রিফাত হাসানকে মারধরের সময় সেখানে উপস্থিত থাকা সহকারি শিক্ষক উত্তম কুমার গুহ। তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক রিফাতকে মারধর করেছে এটা সত্য। কিন্তু তিনি ধর্মীয় বিষয়ে কোন কথা বলেননি।
নারায়ণগঞ্জ তিনশ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন গনপিটুনিতে আহত স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত। তিনি অভিযোগ করেন, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম তার বোন পারভীন আক্তারকে স্কুলের হেডমাষ্টার পদে বসানোর জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে আসছিলো। শ্যামল কান্তি এ স্কুলের প্রায় সতের বছর ধরে প্রধান শিক্ষক। টিনশেড ভবন থেকে স্কুলকে এখন পাকা ভবনে এনেছেন তিনি। তাই তিনি রাজি হচ্ছিলেন না স্কুলের দায়িত্ব ছেড়ে দিতে। এছাড়া ম্যানেজিং কমিটির বিভিন্ন অপকর্মে তিনি বাধা দিচ্ছিলেন। এজন্য পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যার জন্য ধর্মীয় অবমাননার গুজব ছড়ানো হয়। গত ৮ মে তার স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র রিফাত ক্লাসে বসে কুকিলের ডাক, কাকের ডাক দিয়ে দুষ্টুমি করছিলো। তিনি না করলেও সে শুনছিলো না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি রিফাতকে চর মারেন। এ বিষয়টিকে অযুহাত করে স্কুলের ম্যেেনজিং কমিটির সভাপতি, কমিটির সদস্য ইউএনও অফিসের পিয়ন মিজানুর রহমান, মতিউর রহমান মিজু, মোবারক মিলে গুজব রটায় যে রিফাতকে মারার সময় তিনি ইসলাম ধর্ম বিরোধী কথা বলেছেন। তারা রিফাতের মা রিনা বেগমকে দিয়ে ১৩ মে শুক্রবার এ বিষয়ে একটি অভিযোগ দেয়ায়। শুক্রবার তাকে স্কুলে ডেকে আনা হয় এ বলে যে, স্কুলে এমপি সাহেবের দেয়া পঞ্চাশ লাখ টাকা উন্নয়নের কাজে ব্যবহারের ব্যাপারে মিটিং হবে। তিনি স্কুলে আসার কিছুক্ষনের মধ্যে পার্শ্ববর্তী মসজিদের মাইকে তিনি ধর্মীয় অবমাননা করেছেন বলে প্রচার করে জনসাধারনকে স্কুলে আসতে আহ্বান জানানো হয়। তিনি এ ব্যাপারে মামলা করবেন কিনা ? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি নিজেই নিরাপত্তাহীনতায় আছি। তাই মামলা করার বিষয় ভাবতে পারছিনা। তিনি ঘটনার সাথে জড়িতদের শাস্তি দাবী করে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।
গতকাল এলাকায় গিয়ে পাওয়া যায়নি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলামকে। তার চাচাতো বোন স্কুলের সহকারি প্রধান শিক্ষিকা পারভীন আক্তার জানান, এ ঘটনার সাথে আমি জড়িত না। আমার যোগ্যতা থাকলে আমি প্রধান শিক্ষক হবো। না হলে সহকারি প্রধান শিক্ষকই থাকবো। তাকে অপসারন করার কোন পরিকল্পনা আমার ছিলোনা। তিনি জানান, আমি ট্রেনিংয়ে থাকায় আমি স্যারকে দেখতে যেতে পারিনি।
স্কুলের ম্যনেজিং কমিটির আরেক সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, রিফাতের বাবা মা পাঞ্চায়েতের কাছেও গেছে। কিন্তু তারা কারো কাছেই বলেনি যে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করছে। বলেছে যে মেরেছে। তারা মারের বিচার চেয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনার পর ম্যনেজিং কমিটির সভাপতি এলাকায় নেই বলে আমরা শুনেছি।
ঘটনা তদন্তে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আ খ ম নুরুল আলমকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মৌসুমী হাবিব।
বন্দর থানার ওসি আবুল কালাম ঘটনা সম্পর্কে বলেন, প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হচ্ছে শুনে আমরা গিয়ে উদ্ধার করে আনি। তাকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে পুলিশ হেফাজতে। তবে এ ব্যাপারে কোন মামলা হয়নি। কেউ মামলা করতে আসেনি।
এ ব্যাপারে এমপি সেলিম ওসমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের পরে কমিটির ব্যাপারে ব্যবস্থা হবে। আমি জানতে পারি যে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে ঐ স্কুলের প্রধান শিক্ষককে মারধর করা হচ্ছে। খবর পেয়ে আমি সেখানে পুলিশ পাঠাই। পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। কিন্তু তাকে বাইরে নিয়ে আসতে পারছিলোনা। কয়েক হাজার জনতা তাদের ঘিরে রেখেছিলো। খবর পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে জনতাকে নিয়ন্ত্রনের জন্য তাকে কান ধরে ওঠ বস করিয়ে তাকে উদ্ধার করি। তাকে থানায় নিয়ে নিরাপত্তা হেফাজতের ব্যবস্থা করি। তিনি বর্তমানে হাসপাতালে নিরাপত্তা হেফাজতে রয়েছেন।#

ভিডিওটি দেখতে চাইলে ক্লিক করুন: